কিভাবে ইন্ট্রা ডে ট্রেডিং এর জন্য স্টক নির্বাচন করবেন? নতুনদের জন্য

5/5 - (2 জন রেটিং করেছেন)

‘ট্রেডিং বিদ্যা বড় বিদ্যা যদিনা করো লস।’ ট্রেডিং, বিশেষত ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং ভীষণই ঝুঁকিপূর্ণ একটা কাজ। কিন্তু ভালো করে আয়ত্ত করা গেলে এটা আয় করার একটা অসাধারণ উপায় হতে পারে। এর নাম থেকেই পরিষ্কার, এটা মানে হচ্ছে একদিনের ভেতরেই ট্রেডিং বা কেনা ও বেচার প্রক্রিয়াটা শেষ করা।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেখানে বছরের পর বছর শেয়ার ধরে রেখে লাভের কথা ভাবতে হয় সেখানে ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং-এর ক্ষেত্রে ঘণ্টা, মিনিট, এমনকি সেকেন্ডের বিচারেও লাভের পরিকল্পনা করতে হয়। আবার যেখানে কেবলমাত্র শেয়ারের দাম বাড়লেই বিনিয়োগে লাভ হয়, ট্রেডিং-এ কিন্তু শেয়ারের দাম বাড়া এবং কমা (শর্ট সেল) দুই ক্ষেত্রেই লাভ করা যায়।

তাই বিনিয়োগের জন্য শেয়ার বা স্টক বেছে নেওয়ার থেকে ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং-এর জন্য স্টক নির্বাচন করার যুক্তি বা পদ্ধতিটা পুরোপুরি আলাদা। ট্রেডিং-এ লাভের সম্ভাবনা বাড়াতে হলে এর বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা মাথায় রেখে অতি স্বল্প সময়ে এদিক, ওদিক বা উভয়দিকে লাভ পাওয়ার উপযুক্ত স্টক বাছাই করা খুবই জরুরী।

কিন্তু শেয়ার বাজারে ৫০০০-এর থেকেও বেশি স্টকের মধ্যে থেকে নিজের প্রয়োজন মাফিক সঠিক স্টক বেছে নেওয়াটা মোটেও সহজ কাজ না। আর তাই সেই কাজকেই সহজ করতে আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং-এর জন্য উপযুক্ত স্টক নির্বাচন করার আগে কোন কোন বিষয় বা ক্রাইটেরিয়া গুলো দেখে নেওয়া প্রয়োজন সেটাই আলোচনা করব এই নিবন্ধে।

যত বেশি লিকুইডিটি থাকে ততই ভালো

ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং মানে হচ্ছে ফটাফট কেনা আর ফটাফট বেচা। তাই এই ঝটপট কেনাবেচা করতে চাইলে যে শেয়ারে যথেষ্ট পরিমাণ ক্রেতা ও বিক্রেতা থাকে সেই ক্ষেত্রেই সহজে এবং খুব তাড়াতাড়ি এই কাজটা করা যায়। যথেষ্ট পরিমাণ ক্রেতা-বিক্রেতা না থাকলে অর্থাৎ অর্ডার ভল্যুম কম হলে শেয়ারের লিকুইডিটি কম হয় এবং তৎক্ষণাৎ অর্ডার এক্সিকিউশনে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে আসলে যে দামে কিনতে বা বেচতে চাওয়া হয় সেই দামে কেনাবেচা সম্ভব হয়না, মানে ইম্প্যাক্ট কস্ট বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ একটা ট্রেডে আপনি যতটা লাভের প্রত্যাশা করবেন ততটা না হতে পারে কিংবা কপাল খারাপ হলে সবকিছু ঠিকঠাক করার পরেও একটা লাভের ট্রেড লসে শেষ হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  টেকনিক্যাল এনালাইসিসের 8 টা মিথ বা ভুল ধারণা। #6 খুব গুরুত্বপূর্ণ

তাই ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং এর ক্ষেত্রে উচ্চ লিকুইডিটি সম্পন্ন শেয়ার বেছে নেওয়া সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

আবার এধরণের উচ্চ লিকুইডিটি সম্পন্ন শেয়ার বাছার ক্ষেত্রে দেখতে হবে যে, কেমন দামে কেমন লিকুইডিটি থাকে। কারণ কিছু কিছু শেয়ারের ক্ষেত্রে একটা দামে গিয়ে লিকুইডিটি বাড়লেও দাম বেড়ে গেলে বা অন্য প্রাইস লেভেলে গিয়ে লিকুইডিটি কমে যায়।

ভোলাটিলিটি

প্রত্যাশা অনুযায়ী কম সময়ের মধ্যে যখন শেয়ারের দাম বাড়ে কিংবা কমে একমাত্র তখনই ইন্ট্রা-ডে ট্রেডাররা লাভ করতে পারে। প্রত্যাশার বিপরীতে গেলে যেমন লাভের বদলে ক্ষতি হয় তেমনই কেনার পর যদি শেয়ারের দামের সেরকম কোনো পরিবর্তন না হয় বা স্থির থাকে তাহলেও কিন্তু কোনো লাভ করা যায় না।

নির্দিষ্ট সময়ে একটা শেয়ারের দাম কতটা বাড়া-কমা হচ্ছে তার মাপকে ভোলাটিলিটি বলে। যে শেয়ারে ভোলাটিলিটি নেই সেই শেয়ার ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং এর জন্য উপযুক্ত নয়। আবার অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত ভোলাটিলিটি থাকলে প্রত্যাশার দিকে শেয়ারের দামের পরিবর্তনে যেমন লাভ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তেমনই প্রত্যাশার বিপরীতে গেলে অনেক বেশি ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকে। এমনকি এক্ষেত্রে স্টপলস ব্যবহার করলেও হঠাৎ একটা পাগলাটে দামের পরিবর্তন স্টপলস হিট করে দিতে পারে।

তাই মধ্যপন্থা অনুসরণ করাই শ্রেয়। মানে এমন শেয়ার বেছে নিতে হবে যার ভোলাটিলিটি মাঝামাঝি থেকে বেশি কিন্তু অতিরিক্ত বেশি নয়। এব্যাপারে যদিও কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই, তবে যে সমস্ত শেয়ারের দাম উভয় দিকে ৩-৫% পরিবর্তিত হয় সেই সমস্ত শেয়ারকে ইনট্রা-ডে ট্রেডিং এর জন্য আদর্শ ধরা হয়।

কোরিলেটেড স্টক

সমগ্র বাজারের বেঞ্চমার্ক ইনডেক্স (যেমন নিফটি ৫০) কিংবা অন্য কোনো মুখ্য থিম্যাটিক বা সেক্টরাল ইনডেক্সের সাথে কোরিলেটেড বা সম্পর্কিত স্টক বেছে নেওয়া ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং এর জন্য ভালো। বাজারের ট্রেন্ড অনুযায়ী এই সমস্ত ইনডেক্স গুলোও পরিবর্তিত হয় আর তার সাথে কোরিলেটেড স্টকগুলোর দামও পরিবর্তিত হয়। ফলে ইনডেক্সের চার্ট দেখে বাজার বা বিশেষ কোনো একটা সেক্টরের ট্রেন্ড বোঝা গেলেই এই সমস্ত স্টক গুলোর দামের পরিবর্তন সম্পর্কেও সহজেই একটা ধারণা পাওয়া যায় এবং ট্রেড করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

আরও পড়ুনঃ  শর্ট সেলিং-এর সাতকাহন। যখন শেয়ারের দাম কমলেও লাভ হয়…!

যেমন, ধরুন দেশি এবং বিদেশী বাজারে ওভারঅল একটা পজিটিভ সেন্টিমেন্ট বিরাজ করছে। সেক্ষেত্রে বেঞ্চমার্ক ইনডেক্সের সাথে কোরিলেটেড যেকোনো শেয়ার কেনা যেতে পারে বা লং পজিশন নেওয়া যেতে পারে, কারণ প্রধান ইনডেক্সের সাথে সাথে ওই শেয়ারের দামও বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে। আবার ধরুন কোনো একটা সেক্টর সম্পর্কে কিছু একটা নেগেটিভ খবর প্রকাশ্যে এসেছে। এমতাবস্থায় ওই সেক্টর বা সেক্টরাল ইনডেক্সের কোরিলেটেড কোনো শেয়ার শর্ট সেল করা উচিত হবে কারণ এক্ষেত্রে ঐ সেক্টরের সাথে সাথে কোরিলেটেড শেয়ারগুলোর দামও কমার সম্ভাবনা থাকবে।

স্ট্রং আর উইক স্টক

নির্দিষ্ট ট্রেন্ড অনুসরণকারী লিকুইড স্টকগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যথাঃ স্ট্রং আর উইক স্টক। স্ট্রং বা উইক স্টকের দাম ট্রেন্ড অনুযায়ীই পরিবর্তিত হয় তবে প্রথমটির ক্ষেত্রে ট্রেন্ডের থেকে আরও তীব্রভাবে এবং দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে ট্রেন্ডের থেকে ধীর গতিতে। ধরে নিই বাজার ২% উঠলো, তাহলে স্ট্রং স্টক উঠবে তার থেকে বেশি অর্থাৎ উদাহরণস্বরূপ ৩-৪% আর উল্টোদিকে উইক স্টক উঠবে তার থেকে কম, উদাহরণস্বরূপ ১%।

সাধারণত বাজারে যখন আপ ট্রেন্ড চলে তখন লাভের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য স্ট্রং স্টক বেছে নিতে হয় আর ডাউন ট্রেন্ডের সময় ক্ষতির পরিমাণ কম রাখতে উইক স্টক বেছে নিতে হয়।

টেকনিক্যাল অ্যানালিসিস

উপরের বৈশিষ্ট্য গুলো অনুযায়ী স্টক বেছে নেওয়ার পরে সেগুলোর চার্ট দেখে টেকনিক্যাল অ্যানালিসিস করতে হয়। নিজের পছন্দের স্ট্রাটেজি অনুযায়ী যেসমস্ত স্টকের চার্টে ভালো প্যাটার্ন তৈরি হয়েছে, সম্ভাব্য গতিবিধি সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে এবং পরিষ্কার এন্ট্রি ও এক্সিট প্ল্যান করা যাচ্ছে সেসমস্ত স্টকগুলো ফাইনালাইজ করা যেতে পারে।

ডেরিভেটিভ সেগমেন্ট-এর স্টক

ডেরিভেটিভ মার্কেটে যে সমস্ত স্টকের ট্রেড হয় সেগুলো ইন্ট্রা-ডে ট্রেডিং করার জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে। কারণ সাধারণত ডেরিভেটিভ সেগমেন্টের স্টকগুলোয় ভালো লিকুইডিটি থাকে এবং পরিমিতভাবে ভোলাটাইল-ও হয়। এনএসই ওয়েবসাইট থেকে এই সমস্ত স্টকগুলোর তালিকা এই লিঙ্কে পাবেন।

আরও পড়ুনঃ  এসআইপি শুরু করার আগে যে সমস্ত বিষয়গুলো না জানলেই নয়…

শেষ কথা

থিওরিটিক্যাল সূত্র যতই পড়ে নিন না কেন, ট্রেডিং এর দুনিয়ায় প্র্যাকটিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স টাই আসল। ফিল্ডে নেমে যখন কাজ করবেন এবং আপনার যত বেশি অভিজ্ঞতা হবে, ট্রেডিং-এর জন্য স্টক নির্বাচন করতে আপনি ততই পটু হয়ে উঠবেন। আর তখন নিজেই বুঝতে পারবেন কোন ধরনের স্টকগুলো আপনার ট্রেডিং স্টাইলের সাথে বেশি খাপ খায়।

আজ তাহলে এখানেই শেষ করি। ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন