কিভাবে শেয়ার বাজারে একজন সফল ট্রেডার হয়ে উঠবেন? নতুনদের জন্য

4.5/5 - (8 জন রেটিং করেছেন)

শেয়ার বাজারে ট্রেডিং করে সফল হওয়ার কিংবা মোটা টাকা কামানোর স্বপ্ন অনেকে দেখলেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয় হাতে গোনা কিছু ট্রেডারই। ভারতবর্ষের বেশীরভাগ ট্রেডারের জনপ্রিয় ব্রোকার জিরোধার প্রতিষ্ঠাতা নীতিন কামাথ একবার একটা অস্বস্তিকর পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তিন বছরের টাইম ফ্রেমে মাত্র ১% সক্রিয় ট্রেডার ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের থেকে বেশি হারে উপার্জন করতে সক্ষম।

অতএব, ঐ পরিসংখ্যান থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যেতেই পারে যে, ট্রেডিং-এ সফলতার প্রকৃত হার মাত্র ১%। আর একজন ট্রেডার হিসাবে কিভাবে ওই সফল ১% এর মধ্যে আসা যাবে সেটাই আজকের নিবন্ধের আলোচনার বিষয়।

আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ আবশ্যিক

লোভ আর ভয় বাজার চালনা করে। শেয়ারের দাম ওঠানামা করে এখানে অংশগ্রহণকারীদের সমষ্টিগত লোভ আর ভয়ের কারণেই। যখন ক্রেতাদের লোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে তখন তারা শেয়ারের ন্যায্য দামের থেকে অনেক বেশী দাম দিতেও রাজি হয়ে যায়, ফলে শেয়ারের দাম উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। আর অন্যদিকে যখন বাজারে ভয়ের আধিপত্য চলে তখন বিক্রেতারা শেয়ারের ন্যায্য দামের থেকে কম দামে বেচতে রাজি হয়ে যায় ফলে শেয়ারের দাম পড়তে থাকে।

কিন্তু একজন ট্রেডার হিসাবে এখানে জিততে হলে এই লোভ আর ভয়ের অনুভূতির উপর নিয়ন্ত্রণ পেতেই হবে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে কখনো ভয়ের বশবর্তী হয়ে ভালো ট্রেড হয় নেওয়াই হবে না বা হলেও কম লাভেই ছেড়ে দেওয়া হবে; কিংবা কখনো ট্রেড নেওয়ার পর দাম প্রত্যাশার বিপরীতে গেলে লসের পরিমাণটা বড় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। অন্যদিকে লোভে পড়ে কখনো অনুপযুক্ত সময়ে খারাপ ট্রেড নেওয়া হয়ে যাবে কিংবা নিশ্চিত লাভ হাতছাড়া হয়ে যাবে।

এই আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার কথা বলাটা যত সহজ করাটা ততই কঠিন। তবে এই কাজটা সহজ হবে যদি ট্রেডিং-টা একটা সিস্টেম বা পরিকল্পনা মাফিক করা হয়।

ট্রেডিং-এর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া চলবে না

সফলভাবে ট্রেডিং করতে হলে নিজের জন্য উপযুক্ত একটা ট্রেডিং পরিকল্পনা বা স্ট্র্যাটেজি থাকা আবশ্যক। এতে যেমন নিজের আবেগকে সাইডে রাখা যায়, তেমনই শেয়ার বাজারের প্রবল বিশৃঙ্খলার মধ্যে পা ফেলার একটা রাস্তা পাওয়া যায়।

ট্রেডিং-এর পরিকল্পনার প্রাথমিক দিক হচ্ছে,

  • এন্ট্রি ও তার সাথে এক্সিট করার শর্ত আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া।
  • ঠিকঠাক রিস্ক-রিওয়ার্ড রেশিও মেনে এন্ট্রি অনুযায়ী ন্যূনতম টার্গেট এবং সর্বাধিক স্টপ লস লেভেল নির্ধারণ করে নেওয়া।
আরও পড়ুনঃ  শেয়ার বাজারের বহুল ব্যবহৃত 40+ টি গুরুত্বপূর্ণ টার্ম বা পরিভাষা ও তাদের অর্থ

এছাড়া প্ল্যান করার সময় আরও কয়েকটা বিষয়ের উপর খেয়াল রাখা জরুরী। যেমন,

  • ট্রেন্ড-ই ফ্রেন্ডঃ শর্ট টার্ম ও লং টার্ম ট্রেন্ডের উপর খেয়াল রেখে এবং ট্রেন্ডের দিকে পরিকল্পনাটা করা উচিত।
  • অন্যের স্ট্রাটেজি নিজের নয়ঃ নিজের ক্যাপিটালের পরিমাণ, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, পরিস্থিতি, টাইম ফ্রেম, ট্রেডিং ইন্সট্রুমেন্ট ইত্যাদি অনুযায়ী নিজের জন্য উপযুক্ত স্ট্রাটেজি নিজেকেই তৈরি করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। অন্যের তৈরি করা স্ট্রাটেজি বা অন্যের টিপস ফলো করা মানে নিজেরই সর্বনাশ ডেকে আনা।

স্টপ-লসের সঠিক ব্যবহার চাই-ই-চাই

ট্রেডিংয়ে সফল বা বিফল হওয়ার মাপকাঠি একটাই, লাভ-লোকসান। সফল সে-ই যে লাভ করতে সক্ষম আর অন্যদিকে বিফল মানে যার ক্ষতির পরিমাণ লাভের অঙ্কের থেকে বেশি! তাই ট্রেডিং-এ সফলতার মূলমন্ত্র হচ্ছে ‘লাভ বড় হতে দাও আর লস ছোটো রাখো।’ লাভ কত বড় হবে সেটা আসলে বাজার ঠিক করে আর ট্রেডারকে রিস্ক-রিওয়ার্ড রেশিও অনুযায়ী একটা ন্যূনতম টার্গেট স্থির করে শুধু ট্রেন্ডের সাথে লেগে থাকতে হয়। অন্যদিকে, লস কত বড় হতে দেওয়া হবে সেটা নির্ধারণ করার ক্ষমতা থাকে ট্রেডারের কাছে। আর ট্রেডারকে এই ক্ষমতা দেয় ‘স্টপ-লস’ অর্ডার।

ট্রেডিং প্ল্যান করতে টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস করতে হয়। কিন্তু যত ভালো ভাবেই টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস করা হোক না কেন, আগামীতে কি হতে চলেছে সেটার ১০০% নিখুঁত ধারণা করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। তাই পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ ট্রেডার হোক বা একেবারে নতুন ট্রেডার, বাজার প্রত্যাশামত দিকে না গেলে লসটাকে সীমিত রাখতে স্টপলস সবাইকেই ব্যবহার করতে হয়।

সাধারণ লাভ লসের নিয়ম অনুযায়ী সম্ভাব্য ন্যূনতম টার্গেটের থেকে কম স্টপলস রাখা ছাড়া এখানে জেতা সম্ভব নয়। তবে চেষ্টা থাকা উচিৎ টার্গেট যেন কমপক্ষে স্টপলসের থেকে ডবল হয়। আর তার সাথে আরও একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হয়, এটা যেন এন্ট্রি পয়েন্টের খুব কাছে না থাকে। ভুলে গেলে চলবে না, শেয়ারের দাম অল্প সময়ের ব্যবধানে ভীষণভাবে উপরনিচ হয়। তাই এটা খুব কাছে থাকলে একটা ভালো ট্রেডও স্টপলস হিট করে বিগড়ে যেতে পারে।

স্টপলস খুব কাছে না রেখে ট্রেড পরিকল্পনা করার জন্য দরকার লসের ভয়কে জয় করা। আর এটা তখনই সম্ভব হয় যখন পর্যাপ্ত ক্যাপিটালের সাপোর্ট থাকে।

পর্যাপ্ত ক্যাপিটাল অপরিহার্য

অল্প ক্যাপিটালে প্র্যাকটিস সম্ভব হলেও, ট্রেডিং-এ সফল হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ক্যাপিটাল থাকা অত্যাবশ্যক। এর অভাবে অনেক ধরণের অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। যেমন,

  • ঠিকঠাক স্টপলস নেওয়ার সাহস পাওয়া যায়না।
  • কম কোয়ান্টিটিতে ট্রেড করার জন্য তুলনায় ব্রোকারেজ বেশি পড়ে।
  • অনেক স্ট্রাটেজি কম ক্যাপিটালে ব্যবহারই করা যায় না।
  • নিয়ম বলে একটা ট্রেডে মোট ক্যাপিটালের ১-২% এর বেশি ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু ক্যাপিটাল যখন অপর্যাপ্ত তখন এর থেকে অনেক বেশি ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। আর অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার জন্য ক্যাপিটাল ফুড়ুত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • লস হলে ক্যাপিটালের অনেকখানি হারাতে হবে এই ভয়ে অনেকসময় অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যায়। মানে আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
আরও পড়ুনঃ  সবথেকে দামী শেয়ার যাদের এমন 10 ভারতীয় কোম্পানি। #3 জামার ভিতরে...

কম ক্যাপিটালের সমস্যা মেটাতে অনেক সময় নতুন ট্রেডার অতিরিক্ত লেভারেজ ব্যবহার করে। আর সেটা করতে গিয়ে আরো বড় সমস্যা ডেকে আনে।

অতিরিক্ত লেভারেজ নয়

ট্রেডিং-এর ক্ষেত্রে লেভারেজ কম ক্যাপিটালের সমস্যার সাময়িক সমাধান করে বেশী অঙ্কের ট্রেড করতে সক্ষম করে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। অতিরিক্ত লেভারেজ নিয়ে করা ট্রেডে একটা বড় ভুল পুরো ট্রেডিং ক্যাপিটালকে শূন্যও করে দিতে পারে!

লেভারেজ তাদের জন্য ভালো হতে পারে যাদের এটা হ্যান্ডেল করার অভিজ্ঞতা আছে। একজন অনভিজ্ঞের হাতে এটা স্ব-ধ্বংসকারী অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়!

আলাদা ইনকামের সোর্স থাকা চাই

‘যারা আয়ের জন্য শুধুমাত্র ট্রেডিং-এর উপর নির্ভর করে, তাদের থেকে যে সমস্ত ট্রেডারের অন্য আয়ের উৎস থাকে তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়।’ – নীতিন কামাথ

ট্রেডিং-এ মোহিত হয়ে যারা ট্রেডার হতে চায় তারা অনেকেই ক্যাপিটাল জোগাড় করে প্রথমেই পুরোপুরিভাবে এই কাজে নেমে পড়ে। কিন্তু এভাবে একটা স্থির ক্যাপিটাল নিয়ে ট্রেড করা মানে দৈনিক বা মাসিক লাভ করার একটা চাপ তৈরি হয় কারণ ওই লাভ থেকেই তাদের সংসারের খরচ চালাতে হয়। এই চাপটা ট্রেডিং প্রক্রিয়ার জন্য ভালো হয় না। এটা অনেক সময় আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাবার কিংবা ট্রেডের পরিকল্পনা অনুসরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ হয়।

তাই ট্রেডিং-এ সফলতার রাস্তায় লসগুলোকে সহজে হজম করতে, পর্যাপ্ত ক্যাপিটালের সরবরাহ অক্ষুন্ন রাখতে, অতিরিক্ত লেভারেজের ব্যবহার এড়াতে এবং অন্য সবার থেকে একটু এগিয়ে থাকতে ট্রেডিং-এর বাইরে আলাদা ইনকামের সোর্স থাকাটা খুবই জরুরী।

ঝোঁকের বশে ট্রেড করা চলবে না

ট্রেডিং নেশার মত। অনেক সময় ট্রেডাররা কিছুই করার নেই তাই অনবরত ট্রেড করতে থাকে। নীতিন কামাথ একবার বলেছিলেন, ‘সক্রিয় ট্রেডারদের টাকা লস করার সব থেকে বড় কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত ট্রেড করা।’ তাই ঝোঁকের বশে বা ‘এমন সুযোগ আর আসবেনা’ -এই ধরণের চিন্তাভাবনায় ডুবে গিয়ে অনর্থক ট্রেড করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমন অনেক পরিস্থিতি আসে যখন সবথেকে ভালো ট্রেড হচ্ছে কোনো ট্রেড না করা!

ঝাঁপানোর আগে জলে পা ডুবিয়ে দেখতে হবে

নেশা কাটাতে ব্যর্থ হলে কিংবা যখন কোনো ট্রেড সম্পর্কে অনেকটা অনিশ্চিত তখন সর্বনিম্ন পরিমাণের কোয়ান্টিটিতে এন্ট্রি নিয়ে তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী বাকি কোয়ান্টিটি একবারে বা কয়েকভাগে ধাপে ধাপে অ্যাড করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে লসের পরিমাণ অনেক কম হবে।

আরও পড়ুনঃ  লোন নিয়ে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বা ট্রেডিং - চালাকি নাকি বোকামি?

এন্ট্রি, এক্সিট ও স্টপলসের এক একটা নির্দিষ্ট পয়েন্ট স্থির না করে প্রত্যেকটার জন্য এক একটা জোন ঠিক করে সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে কোয়ান্টিটি ম্যানেজ করা মূল ট্রেড প্ল্যানের একটা অংশও করা যেতে পারে।

তবে এটা মানে কিন্তু অ্যাভারেজিং ডাউন নয়!

অ্যাভারেজিং ডাউনের অভ্যাস মানে ‘শেষস্য শীঘ্রম’!

একটা ট্রেড নেওয়ার পর অ্যাভারেজিং ডাউন করা মানে হচ্ছে একটা হারা ট্রেডে আরো কোয়ান্টিটি অ্যাড করা এই আশায় যে, যখন দাম একবার উল্টো দিকে ঘুরবে তখন তাড়াতাড়ি লসটাকে রিকভার করা যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই ‘আশা’ কোনো বৈধ ট্রেডিং স্ট্র্যাটেজি হতে পারেনা! এটা করা মানে আসলে স্টপলসকে উপেক্ষা করে একটা ভুল ট্রেডকে ঠিক করার চেষ্টা করা। এভাবে কখনো কখনো জেতা গেলেও লং টার্মে এই পন্থা ক্যাপিটালের সর্বনাশই ডেকে আনে। 

এই উপায়ের সহজ ও বৈধ বিকল্প হচ্ছে লস ছোটো থাকতে থাকতে প্ল্যান অনুযায়ী স্টপলস ব্যবহার করে ট্রেড ক্লোজ করা!

শেষ কথা

সবশেষে একটাই কথা বলতে চাই, ট্রেডিং-টাই জীবনের সবকিছু নয়। ট্রেডিং ইনকাম করার দারুণ একটা উপায় হলেও যদি আপনি লাভ-লস সহ পুরো ব্যাপারটা উপভোগ না করতে পারেন বা অনবরত লম্বা সময় ধরে ক্রমাগত লস করতে থাকেন, তাহলে একটু থামুন। নতুন করে আবার সবকিছু ভেবে দেখুন।

তাছাড়া খেয়াল রাখবেন, দু-চারটে বাজে ট্রেড যেন আপনার ব্যক্তিগত জীবনটা বিষিয়ে না দেয়। সব সময় মনে রাখবেন ‘ট্রেড করার সুযোগ আবারও পাওয়া যাবে; শেয়ার বাজারে না হলেও পুরোপুরি অন্য কোনো ক্ষেত্রে…!’

আজ এখানেই শেষ করি। ভালো থাকবেন।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)

৯৯% ট্রেডার বিফল কেন হয়?

৯৯% ট্রেডারের বিফল হওয়ার কারণের মধ্যে পড়ে যথাযথ ট্রেডিং স্ট্রাটেজি বা প্ল্যান অনুসরণ না করা, পর্যাপ্ত ক্যাপিটাল না থাকা, আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হওয়া, স্টপ লস ব্যবহার না করা, অন্যের টিপ শুনে ট্রেড নেওয়া, ঠিক মত রিস্ক ম্যানেজ না করতে পারা, ওভার ট্রেড করা ইত্যাদি।

শেয়ার ট্রেডিং শুরু করতে চাই, কী করব?

ট্রেডিং শুরু করার নিয়মনীতি জানতে চাইলে গুপ্তধন ডট কম-এ ট্রেডিং শুরু করার গাইড পড়ে নিতে পারেন।

মন্তব্য করুন