শেয়ার বাজারে ডেরিভেটিভ বা ফিউচার ও অপশন কী? নতুনদের জন্য

4.8/5 - (5 জন রেটিং করেছেন)

শেয়ার বাজারে পা রাখলে ফিউচার বা অপশনে ট্রেড করার প্রলোভন এড়ানো কিন্তু খুব কঠিন। কারণ সোশ্যাল মিডিয়াতে এই দুরকম ইন্সট্রুমেন্ট ট্রেড করে লাখ লাখ লাভের স্ক্রীনশটের কোনো কমতি নেই। আর সেসব দেখে শেয়ার বাজারের এদিকের জলে একবার পা ডুবিয়ে দেখার ইচ্ছে হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া এক্ষেত্রে ট্রেড করার আরও একটা সুবিধে হচ্ছে কম টাকা ব্যবহার করে অনেক বেশি মূল্যের ইন্সট্রুমেন্টের উপর ট্রেড করা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ট্রেড নেওয়া যতটা সহজ ঠিক ততটাই কঠিন নিজের ক্যাপিটাল রক্ষা করা বা লাভের মুখ দেখা। ফিউচার বা অপশনে ট্রেড করার ক্ষেত্রে ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে এই ফিচারটা অন করা বাদ দিয়ে আর কোন কিছুই সহজ নয়।

যাইহোক, এক্ষেত্রে কিছু করতে যাওয়ার আগে এগুলো আসলে কী জিনিস সেটা বোঝা খুবই দরকার।

ফিউচার ও অপশন কী?

ফিউচার আর অপশন দুইই হচ্ছে শেয়ার বাজারের ‘ডেরিভেটিভ’ প্রোডাক্ট। সাধারনভাবে শেয়ার বা ইকুইটি বাজারে যে জিনিসটা কেনাকাটা হয় বা আমাদের সাধারণ জ্ঞানে এখানে যে জিনিসটার ব্যাপারে আমরা সবাই জানি বা বুঝি সেটা হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বা ইকুইটি। আর এই ইকুইটির ডেরিভেটিভ হচ্ছে ফিউচার এবং অপশন।

তবে ডেরিভেটিভ শেয়ার বাজারের অনেকধরনের অ্যাসেট বা ইন্সট্রুমেন্টেরই হতে পারে, যেমন ইনডেক্স (উদাঃ নিফটি 50), কমোডিটি (উদাঃ সোনা), কারেন্সি ইত্যাদি। কিন্তু বোঝার ও আলোচনার সুবিধের জন্য আপাতত ইকুইটি ডেরিভেটিভকেই বেছে নেব।

ইকুইটি ডেরিভেটিভ

এমনিতে ‘ডেরিভেটিভ’ শব্দটার বাংলা মানে হচ্ছে (অন্য বস্তু বা পদার্থ থেকে) উৎপন্ন বা প্রাপ্ত বস্তু। স্কুলে পড়াশোনার সময় জৈব রসায়ন এবং অঙ্কে এই ডেরিভেটিভ নামটা আসে। অঙ্কে বিশেষ কোনো কিছুর সাপেক্ষে সেসম্পর্কিত অন্য কোনো কিছুর পরিবর্তন মাপতে ডেরিভেটিভের প্রয়োজন পড়ে এবং জৈব রসায়নে এক যৌগ থেকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি একই ধরণের কিন্তু আলাদা অন্য আরেক যৌগকে প্রথম যৌগের ডেরিভেটিভ বলে।

শেয়ার বাজারেও এই ডেরিভেটিভের ধারণাটা অনেকটা একই রকম। এখানে যেকোনো ডেরিভেটিভের যে দাম ধরা হয় সেটা ঐ ডেরিভেটিভের আন্ডারলাইং অ্যাসেট মানে ভিত্তিস্বরূপ শেয়ার বা ইকুইটির দামের উপর নির্ভর করে। যখন কোনো পূর্ব নির্ধারিত তারিখে এবং পূর্বনির্ধারিত দামে কোনো শেয়ার কিনতে আগ্রহী প্রথম পক্ষ, একই শর্তে ঐ শেয়ার বিক্রি করতে আগ্রহী দ্বিতীয় পক্ষের সাথে একটা চুক্তি করতে মনস্থির করে তখন তারা ঐ চুক্তি করে এই ডেরিভেটিভ কেনাবেচার মাধ্যমে।

আর যেহেতু এটা আসলে একটা চুক্তি মাত্র, তাই এর নিজস্ব কোনো বাস্তব মান থাকেনা। এবং এর সাহায্যে বিনিয়োগ-ও করা যায় না। এগুলো খানিকটা আসল শেয়ারের দামের উপর বাজি ধরার মতো। এই ডেরিভেটিভ ব্যবহার করে আপনার নিজস্ব মতামত অনুযায়ী কোনো শেয়ারের ভবিষ্যতের দাম কত হতে পারে সেই অনুমান মাফিক বর্তমানে পজিশন নেওয়া যায়। 

চুক্তির ধরনের উপর নির্ভর করে এই ডেরিভেটিভ দুই ধরনের হয়ঃ

#1 ফিউচার

ফিউচার মানে ভবিষ্যৎ। যদি কখনও কারও মনে হয় যে কোনো শেয়ারের দাম ভবিষ্যতে বাড়তে বা কমতে পারে, তাহলে সে সেই শেয়ারের ফিউচার পূর্ব নির্ধারিত দামে যথাক্রমে কিনতে বা বেচতে পারে।

শেয়ার কেনা আর শেয়ারের ফিউচার কেনা অনেকটা একই রকম। দুই ক্ষেত্রেই এই আশা করে কেনা হয় যে ভবিষ্যতে দাম বাড়বে। কিন্তু ফিউচার কেনা মানে আসল শেয়ার কেনা নয়, শুধুমাত্র একটা চুক্তি করা। যে ফিউচার কিনল সে সেই ফিউচার বিক্রেতার সাথে এই চুক্তি করল যে মেয়াদ শেষের নির্দিষ্ট তারিখে (এক্সপায়ারি ডেট) কিংবা তার আগে শেয়ারের দাম যাই হোক না কেন, ঐ চুক্তি অনুযায়ী যে দামে ফিউচার কিনেছে সেই দামেই ঐ শেয়ারের ডেলিভারি নেবে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই চুক্তির মেয়াদ শেষে (কিংবা স্কোয়ার অফ করার সময়) শেয়ারের দাম যদি চুক্তির সময়ের থেকে বেশি থাকে তবে লাভ হয়, অন্যথায় ক্ষতি।

আর ফিউচার বেচা বা শর্ট (শেয়ার বাজারে কেনার আগে বেচার আরেক নাম) করা মানে মানে সেই ফিউচার যে কিনল তার সাথে এরকম চুক্তি করা যে, মেয়াদ শেষের তারিখে শেয়ারের দাম যাই হোক না কেন, যে দামে ফিউচার সেল করা হল সেই দামেই শেয়ার কিনতে বাধ্য থাকা। সুতরাং এক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে (কিংবা স্কোয়ার অফ করার সময়) শেয়ারের দাম ফিউচার কেনার দামের থেকে কম থাকলে তবে লাভ হয় অন্যথায় ক্ষতি।

আরও পড়ুনঃ  সঠিক স্টক ব্রোকার কিভাবে বেছে নেবেন? ট্রেড-ইনভেস্ট শুরুর আগেই জানুন!

#2 অপশন

অপশন মানে বিকল্প বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। এটা ফিউচার ডেরিভেটিভের থেকে একটু আলাদা। ফিউচার চুক্তিতে মেয়াদ শেষে শেয়ারের ডেলিভারি নেওয়া বা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অপশনের ক্ষেত্রে চুক্তি শেষে নিজ নির্ধারিত দামে (স্ট্রাইক প্রাইস) শেয়ারের ডেলিভারি নেওয়াটা অধিকার কিন্তু কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই, মানে অপশনাল বা ঐচ্ছিক।

অপশন আবার দুই রকম, কল আর পুট।

কল অপশন (CE) – এটা ক্রেতাকে চুক্তি শেষের তারিখে নির্দিষ্ট সংখ্যার আন্ডারলাইং শেয়ার কেনার অধিকার দেয়, তবে বাধ্য করেনা।

পুট অপশন (PE) – এটা ক্রেতাকে চুক্তি শেষের তারিখে নির্দিষ্ট সংখ্যার আন্ডারলাইং শেয়ার বিক্রি করার অধিকার দেয়, তবে বাধ্য করেনা।

বিঃ দ্রঃ উপরের সংজ্ঞা দুটো অপশন এর সাধারণ সংজ্ঞা হলেও ভারতীয় শেয়ার বাজারে ইকুইটি ডেরিভেটিভের ক্ষেত্রে ফিউচারের মতো অপশনেও এক্সপায়ারিতে শেয়ারের ফিজিক্যাল ডেলিভারি নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে ইনডেক্স-এর ক্ষেত্রে ওই সংজ্ঞা যথার্থ।

সব অপশনেরই একটা স্ট্রাইক প্রাইসএক্সপায়ারি ডেট থাকে। যে দামে অপশন ক্রেতা ও বিক্রেতা চুক্তি শেষে আন্ডারলাইং শেয়ার কেনার বা বেচার জন্য সম্মত হয় সেটাই স্ট্রাইক প্রাইস। যেকোনো একটা আন্ডারলাইং শেয়ারের জন্য এর প্রকৃত দামের থেকে কম ও বেশি বিভিন্ন আলাদা আলাদা স্ট্রাইক প্রাইসের অপশন কিনতে পারা যায়। এটা কেনার জন্য বা চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য ক্রেতাকে সব সময়েই পূর্ব নির্ধারিত একটা প্রিমিয়াম দিতে হয় যেটা বিক্রেতার কাছে যায়। এই প্রিমিয়াম আবার স্থির নয়। প্রিমিয়াম কত হবে বা কিভাবে বদলাবে সেটা স্ট্রাইক প্রাইস ছাড়াও অন্য অনেক কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে, যেমন আন্ডারলাইং সিকিউরিটির দাম, এক্সপায়ার হতে বাকি সময়, ভোলাটিলিটি ইত্যাদি (অপশন গ্রিক)।

আর অপশন বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে যাতে এক্সপায়ারি ডেটে ডেলিভারি দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে ফান্ড অপ্রতুল না হয় সেজন্য একটা মোটা টাকা মার্জিন হিসাবে ব্লক করা হয়।

কল অপশনের ক্ষেত্রে আন্ডারলাইং শেয়ারের দামের থেকে বেশি স্ট্রাইক প্রাইসের অপশনকে আউট অফ দা মানি এবং কম স্ট্রাইক প্রাইসের অপশনকে ইন দা মানি বলা হয়। আর পুট অপশনের ক্ষেত্রে বিষয়টা উল্টো, মানে আন্ডারলাইং শেয়ারের দামের থেকে কম স্ট্রাইক প্রাইসের অপশনকে আউট অফ দা মানি এবং বেশি স্ট্রাইক প্রাইসের অপশনকে ইন দা মানি বলা হয়।

এক্সপায়ারি ডেটে সমস্ত আউট অফ দা মানি অপশন চুক্তিগুলো মূল্যহীন হয়ে যায় এবং ক্রেতার দেওয়া পুরো প্রিমিয়াম বিক্রেতার পকেটে চলে যায়। আর ইন দা মানি অপশন চুক্তিগুলো কার্যকর হয় এবং বিক্রেতা ক্রেতাকে স্ট্রাইক প্রাইসের দামে শেয়ারের ডেলিভারি দেয়।

যদি মনে হয় শেয়ারের দাম নিকট ভবিষ্যতে বাড়বে, তাহলে সেসময়ে লাভের জন্য কল অপশন কেনা বা পুট অপশন বিক্রি করা যেতে পারে আর দাম কমতে পারে মনে হলে পুট অপশন কেনা বা কল অপশন বিক্রির কথা ভাবা যেতে পারে।

ফিউচার ও অপশনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যঃ

সমস্ত ডেরিভেটিভ চুক্তির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন, 

লট

ফিউচার বা অপশন, চুক্তি যাই হোক না কেন, সেটা একটা শেয়ারের উপর হয়না। সমস্ত ডেরিভেটিভের চুক্তি শেয়ারের দাম অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার লটে হয়। আর এধরণের চুক্তি করার জন্য এক বা একাধিক লটে এগুলো কিনতে বা বেচতে হয়।

লিভারেজ

একটা লটের শেয়ারের প্রকৃত দাম যত হওয়া উচিৎ ফিউচারের ক্ষেত্রে তার থেকে অনেক কম মার্জিন দরকার পড়ে আর অপশন কেনার ক্ষেত্রে যে প্রিমিয়াম দিতে হয় সেটাও তুলনায় অনেক কম হয়। মানে ডেরিভেটিভ সামগ্রিকভাবে উচ্চ লিভারেজ যুক্ত ইন্সট্রুমেন্ট। মানে এক্ষেত্রে অনেক কম ক্যাপিটালেই উচ্চ মূল্যের ট্রেড করা যায়।

ফলে এক্ষেত্রে যেমন লাভের পরিমানের বা পার্সেন্টেজের সম্ভাবনা বাড়ে, সাথে সাথে বাড়ে বড় ক্ষতির ঝুঁকিও।

এক্সপায়ারি, এক্সারসাইজ (কার্যকর করা) ও স্কোয়ার অফ

প্রত্যেক ডেরিভেটিভের একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে সেটা আগেই বলেছি। মাসিক ডেরিভেটিভের এই এক্সপায়ারি ডেট হয় সাধারণত প্রতিমাসের শেষ বৃহস্পতিবার। আর যেকোনো অ্যাসেটের মাসিক ডেরিভেটিভ সাধারণত 3 ধরণের মাসিক সাইকেলের হয়ে থাকে, যথা এক, দুই ও তিন মাসের এবং এদের এক্সপায়ারি ডেট থাকে যথাক্রমে বর্তমান মাস, আগামী মাস ও আগামী মাসের পরের মাসের শেষ বৃহস্পতিবারে।

এক্সপায়ারি ডেট আসার আগেই যেকোনো ধরনের ডেরিভেটিভ স্কোয়ার অফ করা যায়। মানে এক্সপায়ারিতে এক্সারসাইজ বা কার্যকর করার জন্য অপেক্ষা না করেই ডেরিভেটিভ কেনা থাকলে বেচে বা বেচা থাকলে কিনে মানে উল্টো কাজ করে সেটাকে স্কোয়ার অফ করে নেওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  আইপিও সম্বন্ধে যা কিছু বিনিয়োগকারীদের না জানলেই নয়...।

আবার চুক্তি কার্যকর করতে চাইলে বা এক্সারসাইজ করতে চাইলে অপশনের ক্ষেত্রে এক্সপায়ারি ডেট পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকলেও ফিউচারের ক্ষেত্রে এক্সপায়ারি ডেট আসার আগেও এক্সারসাইজ করা যায়।

ফিউচারের আরো একটা বৈশিষ্ট্য হলো এক্সপায়ারি ডেট আসার পরেও চাইলে একটা ফিউচার কন্ট্রাক্ট কে পরের মাসের ফিউচার কন্ট্রাক্টে রোল ওভার করা যায়।

কোন কোন শেয়ারের এবং শেয়ার বাদে আর কিসের ডেরিভেটিভ হয়?

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য যত শেয়ারের অস্তিত্ব আছে সেই সমস্ত শেয়ারের ডেরিভেটিভ কিন্তু হয় না। যে সমস্ত শেয়ার কিছু বিশেষ শর্ত পূরণ করে (যেমন উচ্চ লিকুইডিটি) সেই সমস্ত শেয়ারেরই ডেরিভেটিভ থাকে। ডেরিভেটিভযুক্ত শেয়ারের পুরো তালিকা দেখতে চাইলে এই লিংকে যেতে পারেন।

আগেই বলেছি এবং আবারও বলছি, শেয়ার ছাড়াও শেয়ার বাজারের বিভিন্ন ইনডেক্স, ইন্টারেস্ট রেট এবং কমোডিটি ও কারেন্সি মার্কেটের বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্টেরও ডেরিভেটিভ হয়। আর ওই সমস্ত ডেরিভেটিভের কার্য পদ্ধতিও উপরে বর্ণিত ইকুইটি ডেরিভেটিভের মতোই হয়।

ইনডেক্স ডেরিভেটিভ

শেয়ার ছাড়া অন্য সমস্ত রকম আন্ডারলাইং অ্যাসেটের ডেরিভেটিভের মধ্যে ইনডেক্স ডেরিভেটিভের কথা বিশেষভাবে না বললেই নয়। বিগত কয়েক বছরে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ বা এনএসই বিশ্বের সবথেকে বড় ডেরিভেটিভ এক্সচেঞ্জের শিরোপা পেয়ে আসছে। আর এর প্রধান কারণ হলো এনএসই-র নিফটি 50 ও ব্যাঙ্ক নিফটি ইনডেক্সের ডেরিভেটিভের ওপর প্রচুর পরিমাণে ট্রেড হওয়া। এই দুই প্রধান ইনডেক্সের ডেরিভেটিভ ছাড়াও নিফটি ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও নিফটি মিডক্যাপ সিলেক্ট ইনডেক্সেরও ডেরিভেটিভের অস্তিত্ব আছে।

ইকুইটি ডেরিভেটিভের সাথে ইনডেক্স ডেরিভেটিভের প্রধান একটা তফাৎ হচ্ছে এদের আলাদা প্রকৃতির আন্ডারলাইং অ্যাসেট। ইকুইটি ডেরিভেটিভের ক্ষেত্রে আন্ডারলাইং অ্যাসেট প্রকৃত শেয়ার বা স্টক, চুক্তির শেষে যেটার প্রকৃত ফিজিক্যাল ডেলিভারি নেওয়া যায় কিন্তু ইনডেক্স ডেরিভেটিভের ক্ষেত্রে আন্ডারলাইং অ্যাসেট যেহেতু একটা ইনডেক্স, তাই সেটার ফিজিক্যাল ডেলিভারি নেওয়া সম্ভব নয়। এই কারণে ইনডেক্স ফিউচার বা অপশনে ট্রেড করলে চুক্তি শেষে ডেলিভারি চাইলে ক্যাশে ডেলিভারি নিতে হয়।

আর আগেও বলেছি, আরেকবার বলছি, ভারতীয় শেয়ার বাজারে একমাত্র ইনডেক্স অপশনের ক্ষেত্রেই এক্সারসাইজ করা বাধ্যতামূলক নয়।

ইনডেক্স অপশনের ক্ষেত্রে আরও একটা অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায়। যেখানে ইকুইটির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র তিন ধরনের মাসিক অপশন কন্ট্রাক্ট হয়, ইনডেক্সের অপশন কন্ট্রাক্ট এর ক্ষেত্রে ওই তিন ধরনের মাসিক কন্ট্রাক্ট ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সাপ্তাহিক, ত্রৈমাসিক এমনকি বাৎসরিক কন্ট্রাক্টও হয়।

ডেরিভেটিভের ব্যবহার

শেয়ার বাজারের বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীরা আলাদা আলাদা কারণে এবং বিবিধ উপায়ে বিভিন্ন ধরনের ডেরিভেটিভের ব্যবহার করে থাকে। যেমন,

বিনিয়োগ সুরক্ষিত করতে

ডেরিভেটিভের প্রথম প্রচলন হয় এই উদ্দেশ্যেই। নিজের বিনিয়োগের পোর্টফোলিওকে বাজারের অযাচিত পতনের হাত থেকে বাঁচাতে অনেকে এর ব্যবহার করেন।

বাজারে আসন্ন পতনের ব্যাপারে বুঝতে পারলে বা ক্রমাগত পতন হতে থাকলে নিজের পোর্টফোলিওতে কোনরকম প্রকৃত পরিবর্তন না করে বা কোনো শেয়ার না বিক্রি করে কোনো বিশেষ শেয়ারের কিংবা ইনডেক্সের ফিউচার বা কল অপশন শর্ট করে অথবা পুট অপশন কিনে আসল পোর্টফোলিওর ক্ষতিটা এদিকের লাভ দিয়ে লাঘব করা যায়।

ট্রেড করতে

অনেক ট্রেডার যেকোনো ডেরিভেটিভকে শেয়ার এর মত ব্যবহার করে এবং এক্সপায়ারির কোনো পরোয়া না করে বা এক্সপায়ারি পর্যন্ত কন্ট্রাক্ট না ধরে থেকে বা এক্সারসাইজ করার পথে না গিয়ে শুধুমাত্র কেনা-বেচা বা বেচা-কেনার (শর্ট সেল) মাধ্যমে লাভ করার চেষ্টা করে।

অনেকে আবার বাজার / শেয়ারের দাম যেদিকেই যাক না কেন, অপশন ট্রেডিং-এর বিবিধ স্ট্রাটেজি ব্যবহার করে দিকনিরপেক্ষভাবে লাভের চেষ্টা করে।

আরবিট্রেজ করতে

আরবিট্রেজ মানে এক জায়গার মাল বা এক বাজারের মাল অন্য জায়গায় বা অন্য বাজারে বেচার মাধ্যমে দুই বাজারে দামের তফাৎকে কাজে লাগিয়ে লাভের চেষ্টা করা। অনেকে শেয়ার বাজারে আরবিট্রেজ করার জন্য ডেরিভেটিভ ব্যবহার করে থাকে।

একটা উদাহরণ

আজকের তারিখ 3রা মার্চ। আজ বন্ধন ব্যাংকের একটা শেয়ারের দাম 200 টাকার আশেপাশে চলছে। এখন সবে মাসের শুরু। এখন বিভিন্ন পরিস্থিতি দেখে আমার মনে হল, এই মাসের শেষে বন্ধন ব্যাংক এর দাম 220 টাকা পর্যন্ত যেতে পারে।

এই পরিস্থিতির লাভ নেওয়ার জন্য আমি বড় কোয়ান্টিটির শেয়ারই কিনে রাখতে পারি। কিন্তু লম্বা সময়ের জন্য এই কোম্পানির শেয়ার কেনার ইচ্ছা আমার নেই। তাছাড়া বিশাল কোয়ান্টিটির শেয়ার কেনার মত ক্যাপিটালও আমার নেই। ধরে নিলাম আমার ইচ্ছা 1800 শেয়ার কেনার। শেয়ার না কিনে ডেরিভেটিভের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে লাভ পেতে নিম্নলিখিত তিনটে উপায়ের যেকোনো একটা অনুসরণ করা যেতে পারে।

  1. প্রথম উপায়ে আমি এই শেয়ারের এক লট মানে 1800 কোয়ান্টিটির ফিউচার কিনে রাখতে পারি। সরাসরি শেয়ার কিনতে যেখানে প্রায় 3 লাখ 60 হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা সেখানে এমাসের শেষ বৃহস্পতিবারে মানে 27-এ এপ্রিলে এক্সপায়ারির ফিউচার কেনার জন্য আমার খরচ পড়বে মাত্র এক লাখ টাকার মত।
  2. দ্বিতীয় উপায়ে আমি কল অপশন কিনতে পারি। 27শে এপ্রিল এক্সপায়ারির 220 টাকা স্ট্রাইক প্রাইসের কল অপশনের প্রিমিয়াম মাত্র 2 টাকা 60 পয়সা। সুতরাং 1800 কোয়ান্টিটির কল অপশন কিনতে খরচ পড়বে মাত্র 4860 টাকা।
  3. আরও এক উপায়ে আমি পুট অপশন শর্ট সেল করতে পারি। কলের মত একই এক্সপায়ারি ও একই স্ট্রাইক প্রাইসে পুট অপশন প্রিমিয়াম 17 টাকা। কিন্তু যেহেতু অপশন সেল করলে মার্জিন বেশি লাগে তাই এক্ষেত্রে 1 লাখ 40 হাজারের মত মার্জিন লাগবে এবং যে এই কন্ট্রাক্ট কিনবে তার থেকে 30000 টাকার মত প্রিমিয়াম পাওয়া যাবে।
আরও পড়ুনঃ  শর্ট সেলিং-এর সাতকাহন। যখন শেয়ারের দাম কমলেও লাভ হয়…!

এখন যদি এক্সপায়ারি ডেট আসার দিনে বা তার আগেই বন্ধন ব্যাংকের শেয়ারের দাম সত্যি সত্যিই 220 ছাড়িয়ে যায় কিংবা না ছাড়ালেও, শুধু বাড়লেই, উপরের তিন ক্ষেত্রে যা যা হতে পারে…

  1. শেয়ারের সাথে সাথে ফিউচারের দামও বাড়বে এবং এক্সপায়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা না করলেও কিছুটা বাড়লেই ফিউচারের পজিশন স্কোয়ার অফ করে নিলেই লাভ পকেটস্থ করা যাবে। এক্ষেত্রে শেয়ারের দাম প্রতি 1 টাকা বাড়ার জন্য লাভ হবে 1800 টাকা।
  2. আগেই বলেছি অপশনের প্রিমিয়াম আন্ডারলাইং শেয়ারের দাম ছাড়াও বিবিধ ফ্যাক্টর এর উপর নির্ভর করে বাড়া কমা হয়। তবে শেয়ারের দাম বাড়ার জন্য সাধারনভাবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কল অপশনের দাম বাড়বে এবং এক্সপায়ারি আসার আগেই পজিশন স্কোয়ার অফ করে প্রিমিয়ামের বর্ধিত দাম লাভ হিসাবে পকেটস্থ করা যাবে। তবে এক্সপায়ারি পর্যন্ত অপশন স্কোয়ার অফ না করলে এক্সপায়ারির দিনে শেয়ারের দাম যদি 220 টাকার বেশি থাকে সেক্ষেত্রে অপশন কন্ট্রাকটা ইন দা মানি হয়ে যাবে এবং 1800 শেয়ারের স্ট্রাইক প্রাইসে (আসল দাম যাই থাকুক) মানে 220 টাকা দামে ক্যাশ পেমেন্ট করে সেলারের থেকে শেয়ারের ফিজিক্যাল ডেলিভারি নিতে হবে।
  3. শেয়ারের দাম বাড়লে পুট অপশনের প্রিমিয়ামের দাম কমে। সুতরাং পুট অপশন সেল করার জন্য যে প্রিমিয়াম পাওয়া গিয়েছিল শেয়ারের দাম বাড়ার জন্য বর্তমান প্রিমিয়াম আগের প্রিমিয়ামের থেকে কম হয়। ফলে এক্ষেত্রেও এক্সপায়ারের আগে স্কোয়ার অফ করে দিলে আগের প্রিমিয়াম ও এখনকার প্রিমিয়ামের পার্থক্যটা লাভ হিসাবে পকেটস্থ হবে। আর এক্সপায়ারির আগে স্কোয়ার অফ না করলে এক্সপায়ারির সময় শেয়ারের দাম 220 টাকার বেশি হলে পুট অপশনটা আউট অফ দা মানি হিসেবে গণ্য হবে এবং সেটা মূল্যহীন হয়ে যাবে আর পুরো প্রিমিয়াম নিজের লাভ হিসাবে থেকে যাবে।

বিপরীত অবস্থার জন্য বা শেয়ারের দাম কমবে মনে হলে এক্ষেত্রে যা যা করা হয়েছে তার বিপরীত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর যেকোনো ক্ষেত্রে শেয়ারের দাম প্রত্যাশার বিপরীতে গেলে স্টপলস ব্যবহার করে অল্প লস স্বীকার করে ট্রেড বন্ধ করতে হবে।

শেষ কথা

আশা করি শেয়ার বাজারের ডেরিভেটিভের ব্যাপারে প্রাথমিক একটা ধারণা এতক্ষণে আপনার তৈরি হয়ে গেছে। তবে অত আনন্দেরও কিছু নেই, কারণ এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। ডেরিভেটিভ নিয়ে কিছু করার আগে এসম্পর্কে আরো অনেক বিশদে আরো অনেক খুঁটিয়ে জানা প্রয়োজন। তবে একবার ভালো করে জানতে ও বুঝতে পারলে ডেরিভেটিভ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার বা ট্রেড করার অনেক জায়গা আছে এবং যেহেতু এটা হাই রিস্ক হাই রিওয়ার্ড ইন্সট্রুমেন্ট, ভালো করে প্রয়োগ করতে পারলে এক্ষেত্রে ক্ষতির সাথে সাথে লাভের সম্ভাবনাও বিশাল।

আজ তাহলে এখানেই ইতি টানি। ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন