ফ্লেক্সি পার্সোনাল লোন। খুব সহজে ১ মিনিটে যখন খুশি যেমন খুশি টাকা পান।

5/5 - (1 জন রেটিং করেছেন)

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে আর্থিক জরুরি অবস্থা যেকোনো সময়ে দরজায় কড়া নাড়তে পারে কোনো রকম অগ্রিম ঘোষণা ছাড়াই। আর সেজন্য সকলকেই একটা এমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি রাখতে হয়। কিন্তু সব সময় এই ফান্ড হয় তৈরি করা হয়ে ওঠে না, কিংবা কখনো কখনো ফান্ড তৈরি থাকলেও প্রয়োজনের কাছে তা অপ্রতুল হয়ে পড়ে। আর সেই রকম পরিস্থিতিতে পার্সোনাল লোন নেওয়া ছাড়া কোনো রকম উপায় আর থাকে না।

কিন্তু লোন বললেই তো আর পাওয়া যায় না। ব্যাংকে যাও রে, অ্যাপ্লাই কর রে, হাজার ডকুমেন্ট দেখাও রে, নিজের লোন পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ কর রে ইত্যাদি ইত্যাদি অনেকগুলো ধাপ পেরোনোর পর ব্যাংক অনেক ভাবনাচিন্তা করে লোন পুনরুদ্ধার সহজ মনে করলে তবেই লোন মঞ্জুর করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রয়োজন তো আর ব্যাংকের গড়িমসির অপেক্ষায় বসে থাকতে পারে না… তাহলে সমাধান?

এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে নতুন জামানার এক বিশেষ ধরনের ফ্লেক্সি পার্সোনাল লোন। আর এই নিবন্ধে ঐ ব্যাপারেই বিস্তারিত আলোচনা করব।

ফ্লেক্সি লোন কী?

ফ্লেক্সি বা ফ্লেক্সিবল পার্সোনাল লোন হচ্ছে এমন এক ধরনের পার্সোনাল লোন যা প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময়ে ও যেকোনো পরিমাণে টাকা পাওয়ার এবং ইচ্ছেমত শোধ করার সুবিধা দেয়। এক্ষেত্রে ব্যাংক বা এনবিএফসি ঋণগ্রহীতার আয়, ক্রেডিট স্কোর ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে একটা নির্দিষ্ট ক্রেডিট লিমিট আগে থেকেই অনুমোদন করে দেয়। আর ঋণগ্রহীতা তার প্রয়োজন অনুযায়ী যখন খুশি এবং যেকোনো অ্যামাউন্ট (অনুমোদিত লিমিটের মধ্যে) ঝটপট তুলে নিতে পারে এবং নিজের পছন্দের ইএমআই অনুযায়ী বা ডেডলাইনের আগে যখন খুশি শোধ করতে পারে।

ফ্লেক্সি পার্সোনাল লোনের বৈশিষ্ট্য

  • বিভিন্ন ব্যাংক, এনবিএফসি কিংবা আধুনিক ফিনটেক কোম্পানি (কোনো ব্যাংক বা এনবিএফসি-র সাথে গাঁটছড়া বেঁধে) সাধারণত তাদের স্মার্টফোন অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এধরনের লোনের সুবিধা দেয় এবং ওই ওয়েবসাইট বা অ্যাপগুলো থেকে খুব সহজে এবং ঘরে বসে অনলাইনে আবেদন করেই এ ধরনের লোনের জন্য অ্যাপ্রুভাল পাওয়া যায়। আর এটা এক ধরনের পার্সোনাল লোন হওয়ায় এক্ষেত্রে কোনো কোল্যাটারাল বা জমানতেরও প্রয়োজন পড়ে না।
  • প্রথমবার আবেদন করার সময় কেওয়াইসির জন্য নাম, আধার নম্বর, প্যান নম্বর, আয়ের পরিমাণ ইত্যাদি অল্প কিছু তথ্যের প্রয়োজন পড়ে। কিছু কিছু লেন্ডারের ক্ষেত্রে অন্য উদ্দেশ্যে আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট তৈরি করা থাকলে কোনো রকম নতুন তথ্য ছাড়াই সেন্ট্রাল কেওয়াইসি রেজিস্টারের তথ্যের সাহায্যে আবেদন সম্পূর্ণ হয়ে যায়। এবং এক্ষেত্রে সাধারণত কোনোরকম ডকুমেন্টেশনের প্রয়োজন পড়ে না। আর আবেদন করার সময় কোন রকম চার্জও দিতে হয় না।
  • আবেদন গ্রাহ্য হলে ওভারড্রাফট ফেসিলিটির মতো একটা প্রি-অ্যাপ্রুভড বা প্রাক-অনুমোদিত ক্রেডিট লিমিট পাওয়া যায়। কে কতটা লিমিটের অ্যাপ্রুভাল পাবেন সেটা তার আয়, ক্রেডিট হিস্ট্রি বা ক্রেডিট স্কোর ইত্যাদি বিষয়ের উপর নির্ভর করে।
  • প্রয়োজন মত যখন খুশি ওই লিমিটের মধ্যে যেকোনো অ্যামাউন্ট তোলা যায়। এবং এই কাজটা করার জন্য মোবাইল অ্যাপে কয়েকটা ট্যাপ করলেই হয়ে যায়। আবেদন প্রক্রিয়া আগেই সম্পূর্ণ হয়ে থাকায় এক্ষেত্রে আর কিছু করার প্রয়োজন পড়ে না। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই টাকা নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে আসে।
  • ঐ ক্রেডিট লাইন থেকে যতক্ষণ না পর্যন্ত টাকা তোলা হচ্ছে ততক্ষণ কোনো চার্জ বা সুদ দিতে হয় না। আর কোনো বাৎসরিক মেনটেনেন্স ফি-ও দিতে হয় না। যখন টাকা তোলা হয় একমাত্র তখনই সুদ দিতে হয়। আর টাকা তোলার সময় খুব সামান্যই প্রসেসিং ফি লাগে।
  • এক্ষেত্রে সুদের হার কত হবে সেটা ব্যাংক বা এনবিএফসির নীতির উপর নির্ভর করে। কত লোন নেওয়া হচ্ছে, কত দিনে শোধ করা হবে, ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট স্কোর কত ইত্যাদি এই সমস্ত বিষয়গুলো সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
  • একবার এই লোন অ্যাপ্রুভ হয়ে গেলে সেই লিমিট ব্যবহার করে বারে বারে টাকা তোলা যায় এবং সেক্ষেত্রে আলাদা করে আর কোনো আবেদন করার প্রয়োজন পড়ে না।
  • এই ধরনের লোনের ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতা কি কারণে লোন নিচ্ছেন বা কি কাজে ঐ টাকা ব্যবহার করবেন সে বিষয়ে কোনো বিধি নিষেধ থাকেনা।
  • লোন নেওয়ার পর শোধ করার জন্য নিজের সুবিধা মত সময়ের ইএমআই অপশন বেছে নেওয়া যায়। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সুদ টুকু শোধ করে সবশেষে আসল শোধ করার বিকল্পও পাওয়া যায়।
  • টাকা তোলার সময় ইএমআই এর যে বিকল্পই বেছে নেওয়া হোক না কেন, যখন খুশি অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ইএমআই শেষ হওয়ার আগেই লোন ক্লোজ করে দেওয়া যায় এবং সেক্ষেত্রে কোনো অতিরিক্ত ফোর-ক্লোজার ফি লাগে না।
আরও পড়ুনঃ  বড়লোকদের 12 টা অভ্যাস যা আয়ত্ত করলে আপনিও বড়লোক হতে পারবেন

একটা আদর্শ উদাহরণ

এই লোনকে বিভিন্ন ব্যাংক, এনবিএফসি বা আধুনিক ফিনটেক অ্যাপ বিভিন্ন রকম নাম দিয়ে থাকে। এমনই একটা জনপ্রিয় অ্যাপ ক্রেড আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাংকের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে ‘ক্রেড ক্যাশ’ নামে এই সুবিধা দেয়।

এই সুবিধা নিতে চাইলে ক্রেড অ্যাপ থেকে প্রথমবার ‘ক্রেড ক্যাশ’ অপশনে গিয়ে প্রসিড করলে খানিকটা ম্যাজিকের মতোই কয়েকটা ট্যাপে কেওয়াইসি সম্পূর্ণ হয়ে যায়। অতঃপর রিপেমেন্টের জন্য একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লিংক করতে হয়। তারপরই অনুমোদিত লিমিট থেকে টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর জন্য অ্যাকাউন্টটা তৈরি হয়ে যায়।

অ্যাকাউন্ট সেট আপ করার সময় এবং লিমিট অনুমোদন পাওয়ার পর কিন্তু কোনো টাকা কাটেনা। আর এই কাজটা শুধুমাত্র প্রথমবারের জন্যই করতে হয়। ভবিষ্যতে যখনই টাকা তোলার দরকার পড়ুক, কেওয়াইসি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লিংক কোনোটাই দ্বিতীয়বার করার দরকার পড়ে না।

এবার ধরে নিই আমার অনুমোদিত লিমিট সাড়ে ৩ লাখ এবং আমি এর থেকে ২ লাখ টাকা তুলতে চাই। এই অ্যামাউন্ট বেছে নেওয়ার পরে ইএমআই-এর বিভিন্ন বিকল্প অর্থাৎ কত দিনে শোধ করলে কত ইএমআই পড়বে সেটা দেখতে পাওয়া যায়। এবং এক্ষেত্রে মূল টাকার সাথে প্রসেসিং ফি ও সুদ দুইই হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। নিজের পছন্দের ইএমআই বেছে নিয়ে পরের ধাপে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কনফার্ম করে প্রসিড করলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই টাকা অ্যাকাউন্টে চলে আসে।

এখানে অনুমোদিত সাড়ে ৩ লাখ লিমিটের পুরোটাই তোলার জন্য সব সময় রেডি থাকে। ২ লাখ তোলার পরে বাকি দেড় লাখ লিমিট থেকে আবার যখন খুশি টাকা তোলা যায়। এমনকি যত ইএমআই শোধ হতে থাকে তত আরও লিমিট ফ্রি হয়ে যায় ফলে শোধ করার সাথে সাথে আবার ধার নেওয়ার পরিধিটা বাড়তে থাকে।

ফ্লেক্সি লোন নেওয়ার আগে কোন বিষয়গুলোর উপর খেয়াল রাখা উচিত?

ফ্লেক্সি লোনের সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও আছে। এ ধরনের লোন নেওয়ার আগে নিচের বিষয়গুলোর উপর খেয়াল রাখা উচিতঃ

আরও পড়ুনঃ  ক্রেডিট কার্ড থেকে ক্যাশ টাকা তুলবেন? এগুলো না জানলে কিন্তু বিশাল ক্ষতি

#১ সুদের হার

যেকোনো লোনের ক্ষেত্রেই এই বিষয়টা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আর ফ্লেক্সি লোনও এর ব্যতিক্রম নয়। এমনিতে এখানে পাওয়া অতিরিক্ত সুবিধার জন্য সাধারণত অন্যান্য ধরনের পার্সোনাল লোনের থেকে এতে সুদের হার সামান্য বেশি হয়। তার উপর আরও কিছু ব্যক্তি-ভিত্তিক কারণ এক্ষেত্রে সুদের হারের উপর প্রভাব ফেলে (যে ব্যাপারে আগেই উল্লেখ করেছি)।   

এক্ষেত্রে সুদের হার সাধারণত ১১% থেকে ২৮% পর্যন্ত হতে পারে। তাই আপনার ক্ষেত্রে এই হার কত ধার্য হচ্ছে সেটা ভালো করে দেখে নিয়ে এবং অন্যান্য মাধ্যমে লোনের সুদের হারের সাথে তুলনা করে তবেই লোন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ।

#২ অন্যান্য চার্জ

এক্ষেত্রে অ্যাপ্লিকেশন, মেনটেনেন্স এবং প্রি-পেমেন্ট ফি না লাগলেও প্রসেসিং ফি, লেট পেমেন্ট ফি বা অন্যান্য কোন কোন ফি প্রযোজ্য এবং তার পরিমাণ আপনার পছন্দের লেন্ডারের ক্ষেত্রে কত সেই বিষয়টা লোন নেওয়ার আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

#৩ যে কোম্পানি বা অ্যাপ এই লোন প্রোভাইড করছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা

ফ্লেক্সি লোন কোথা থেকে নেবেন সে ব্যাপারে ইদানিংকালে বিকল্প অনেক। নামী অনামী অনেক কোম্পানি এ ধরনের লোনের সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু এই লোনকে কেন্দ্র করে অনেক প্রতারণামূলক কার্যকলাপও হচ্ছে। তাই লোন নেওয়ার আগে এটা দেখে নেওয়া প্রয়োজন যে লেন্ডার কতটা বিশ্বাসযোগ্য। লেন্ডারের সুখ্যাতি, ব্যাকগ্রাউন্ড, ইতিহাস, রিভিউ ইত্যাদি সবকিছু ভালোভাবে দেখে শুনে তবেই পছন্দের লেন্ডার বেছে নেওয়া উচিত।

#৪ লোন নেওয়ার কারণ

এভাবে লোন নেওয়া খুব সহজ বলে অনর্থক কারণে লোন নেওয়ার কিন্তু কোনো মানে নেই। যে কারণে লোন নেওয়ার কথা ভাবছেন সেই কারণটা আসলে ‘প্রয়োজন’ নাকি ‘চাহিদা’ সেটা সবার আগে ভেবে দেখা দরকার। হাতের কাছে সহজে টাকা পাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকেই বেকার কারণে লোন নিয়ে শুধু শুধু ইএমআই-এর বোঝা ঘাড়ে নিয়ে বসে। তাই প্রকৃত ইমারজেন্সি ছাড়া এই লোন নেওয়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

আরও পড়ুনঃ  কেবলমাত্র ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রেখে যারা ঠকছেন তাদের জন্য শেয়ার বাজারে পা রাখার দিশা।

ফ্লেক্সি লোন প্রোভাইড করে এমন কিছু কোম্পানি বা অ্যাপ

শেষ কথা

আশা করি এতক্ষণে এই বিষয়টা পরিষ্কার করে বোঝাতে পেরেছি। এরপর এভাবে লোন নেওয়া আপনার জন্য ঠিক হবে নাকি বেঠিক সেটা আপনার পরিস্থিতি ও চয়েসের উপর নির্ভর করছে। তবে আমার মতে ভালো একটা লেন্ডারের কাছে কেবলমাত্র ইমারজেন্সিতে ব্যবহারের জন্য এ ধরনের একটা অ্যাকাউন্ট খুলে রাখা মন্দ নয়।

আজ তাহলে এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকবেন।

“ফ্লেক্সি পার্সোনাল লোন। খুব সহজে ১ মিনিটে যখন খুশি যেমন খুশি টাকা পান।”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন