শেয়ার বাজারে ভালো শেয়ার চেনার উপায় প্রথমবার বিনিয়োগের জন্য

4.4/5 - (10 জন রেটিং করেছেন)

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের প্রশ্ন উঠলে সবথেকে প্রথমে যে জিনিসগুলো মাথায় আসে সেগুলো হচ্ছে ভালো শেয়ার কিভাবে চেনা যাবে? কোন শেয়ার কিনলে বেশি লাভ হবে? বা কোথায় বিনিয়োগ করা সবথেকে নিরাপদ?

কারণ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনই আবার ঝুঁকিপূর্ণও। বিনিয়োগের জন্য সঠিক শেয়ার বাছতে পারলে যেমন টাকা কয়েক গুন হতে পারে তেমনই আবার ভুল শেয়ার কিনলে সব টাকা ডুবেও যেতে পারে। তাই বিনিয়োগে ভালো ফল পেতে হলে সবার আগে প্রয়োজন ভালো কোম্পানি বা ভালো শেয়ার বাছাই করা।

কিন্তু কাজটা অতটাও সহজ না। কেননা ভারতীয় শেয়ার বাজারে 5000 এরও বেশি কোম্পানি লিস্টেড আছে। সেই বিশাল তালিকা থেকে বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত 10-20-30 টা শেয়ার খোঁজা মানে খানিকটা খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতোই। তাই বিষয়টা সহজ করতে ধাপে ধাপে কিছু কাজ করা যেতে পারে…

সূচীপত্র দেখান

ফিল্টার বা চালুনি দিয়ে ছেঁকে নেওয়া

গ্রাম বাংলার বাড়িতে বাড়িতে মায়েরা চালুনি ব্যবহার করেন খাদ্য দ্রব্য থেকে নোংরা, বালি, কাঁকর কিংবা পোকামাকড় আলাদা করতে। মানে ভালো জিনিস থেকে অপ্রয়োজনীয় আজেবাজে জিনিস বাদ দিতে এর প্রয়োজন পড়ে।

শেয়ার বাজারেও হাজার হাজার শেয়ারের মধ্যে থেকে আজেবাজে শেয়ার বাদ দিয়ে পছন্দমত বিনিয়োগ-যোগ্য ভালো শেয়ার বাছার জন্য ওই চালুনির মতোই ফিল্টার ব্যবহার করা প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে একটা ফিল্টারে কাজ মিটবে না এবং নিজের প্রয়োজনমতো একাধিক আলাদা আলাদা ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে।

“সফল আর দারুণ সফল মানুষের মধ্যে তফাৎ হচ্ছে দারুন সফল মানুষরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই না বলেন।”

-ওয়ারেন বাফেট

তবে এবিষয়ে একটা কথা বলতেই হয়, শেয়ার বাজারে ভালো শেয়ার চেনার কিন্তু কোনো ফুল্প্রুফ ম্যাজিক ফর্মুলা নেই। শেয়ারের সংখ্যা যেমন হাজারে তেমনই হাজার হাজার বিনিয়োগকারীরা তাদের আলাদা আলাদা মানসিকতা ও লক্ষের জন্য সঠিক শেয়ার খুঁজতে আলাদা আলাদা স্কিম বা স্ট্রাটেজি ফলো করে থাকেন।

সুতরাং এ বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা পেতে হলে একটা আর্টিকেল পড়া যথেষ্ট নয়। আপনি এই আর্টিকেল পড়ে বেসিক একটা ধারণা পেতে পারবেন। এর পরেও আপনাকে আরো রিসার্চ করতে হবে, আরও পড়াশোনা করতে হবে এবং তবেই পুরো জিনিসটা ধীরে ধীরে আপনার গ্রিপে আসতে থাকবে।

বিধিসম্মত সতর্কবাণীঃ শেয়ার চেনার আগে জানুন যে আপনি নিজের উপর বাজি ধরছেন

আমেরিকার কিংবদন্তী ইনভেস্টার ওয়ারেন বাফেটের কথা শুনেছেন তো? আপনার যদি স্বপ্ন থাকে একদিন আগামীদিনের ওয়ারেন বাফেট হবেন, এবং সেজন্যই ভালো শেয়ারের খোঁজ শুরু করেছেন, তাহলে শেয়ার ছাঁকাছাঁকি বাছাবাছি শুরু করার আগে কিছু বিষয় জেনে নেওয়া খুবই দরকার।

নিজে নিজে শেয়ার বাছাই করতে বা চিনতে চাইছেন মানে আপনাকে বুঝতে হবে আপনি শেয়ার বাজারের ওভারঅল যা রিটার্ন পাওয়ার কথা সেটাকে বিট করে আরও বেশি রিটার্ন পাওয়ার জন্য আপনার নিজের ক্ষমতার উপর বাজি ধরছেন। আর এটা কিন্তু মোটেও সহজ কাজ না। পৃথিবীর তাবড় তাবড় আলট্রা এক্সপার্ট প্রফেশনাল ফান্ড ম্যানেজারদের (বিবিধ মিউচুয়াল ফান্ড, হেজ ফান্ড ইত্যাদির) একমাত্র কাজ হচ্ছে শেয়ার বাজারের ওভারঅল রিটার্ন বা ইনডেক্স-কে বিট করা। কিন্তু একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে তাদের মধ্যে 84% ফান্ড ম্যানেজার ফান্ড ম্যানেজ শুরু করার পাঁচ বছর পর থেকে ইনডেক্সের বেশি রিটার্ন পেতে ব্যর্থ হন। আবার পনেরো বছরের হিসেবে এই সংখ্যাটা 89%-এর থেকেও বেশি।

আর এত সংখ্যায় এক্সপার্ট ফান্ড ম্যানেজাররা লংটার্মে যেটা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন সেই কাজ আপনার আমার মত সাধারণ ইনভেস্টারদের পক্ষে যে আরোই কঠিন হবে সেটা বলাই বাহুল্য। ফান্ড ম্যানেজারদের তুলনায় আমাদের যেমন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাব আছে তেমনই আবার রিসোর্স, টুল, বিভিন্ন কোম্পানির অভ্যন্তরীণ তথ্য এবং ফান্ডের অপ্রতুলতাও কাজটাকে আমাদের জন্য অনেক বেশি জটিল করে দেয়। তার ওপর এসব করতে গেলে নিজস্ব কিছু ভুল ভ্রান্তি তো থাকবেই। আর এক্ষেত্রে এক একটা ছোট ছোট ভুল ওভারঅল রিটার্ন এর ওপর অনেকখানি প্রভাব ফেলতে পারে।

সুতরাং শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবটার দিকে নজর রেখে নিজে আলাদা করে শেয়ার বাছার ঝামেলায় না গিয়ে কম ঝুঁকিতে এবং ওভারঅল বাজারের রিটার্ন-টা অন্তত পেতে যেকোনো লো-কস্ট ইনডেক্স ফান্ডে বিনিয়োগ করার কথা ভাবা যেতে পারে। এ ব্যাপারে আরও বিশদে জানতে এই লিংকে দেওয়া আর্টিকেলটা পড়ে নিতে পারেন।

এত সব কিছু শোনার পরেও যদি নিজেই শেয়ার বাছার ঝুঁকিটা নিতে চান, তাহলে চলুন এই নিবন্ধের আসল পার্টটা এবার শুরু করা যাক।

প্রথম ফিল্টারঃ আপনার নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী বাছার কাজ শুরু করতে হবে

ভালো শেয়ার খোঁজার আগে বিনিয়োগের পিছনে আপনার নিজের লক্ষ্যটা আসলে কী সেব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। কারণ সেই অনুযায়ী আপনাকে আপনার পছন্দের শেয়ার খুঁজে আপনার পোর্টফোলিও বানাতে হবে। 

আরও পড়ুনঃ  শেয়ার বাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকি কমানোর 10 উপায়। #3 সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ

সবার ক্ষেত্রে বয়স, আয়, রিস্ক নেওয়ার ক্ষমতা, রিস্ক নেওয়ার ইচ্ছা ইত্যাদি বিষয়গুলো আলাদা। আর এগুলো অনুযায়ী বিনিয়োগ থেকে কে কী চায় সেটাও সবার জন্য আলাদা। সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করার জন্য আপনাকে সবার প্রথমে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে আপনি বিনিয়োগ থেকে কী চান বা কতটা রিটার্ন চান? এর পিছনে কারণটা কী? কত দিনের জন্য বিনিয়োগ করবেন? কত টাকা লাগাবেন? কতটা ঝুঁকি নিতে সক্ষম এবং ইচ্ছুক? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব স্থির করতে পারলেই আপনার প্রথম ফিল্টার রেডি হয়ে যাবে।

যেমন ধরুন যদি আপনার বয়স কুড়ির কোটায় হয় এবং এখনো আপনার বিয়ে না হয়ে থাকে মানে কোনো রেসপন্সিবিলিটির বোঝা না থাকে এবং আপনি চল্লিশের কোটায় রিটায়ারমেন্ট নিতে চান, সেক্ষেত্রে আপনার রিস্ক নেওয়ার ক্ষমতাও বেশি এবং ধরে নিতে হবে আপনি রিস্ক নিতেও চান। আর এটাই হল আপনার জন্য স্পিসিফিক একটা ফিল্টার, মানে আপনার লক্ষ্য পূরণের জন্য আপনাকে হাই রিস্ক হাই রিওয়ার্ডের শেয়ার বেছে নিতে হবে।

আবার যদি আপনার বয়স পঞ্চাশের কোটায় হয় আর আপনি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে জাস্ট কিছু এক্সট্রা আয় করতে চান বা একটা রেগুলার ইনকামের সোর্স বানাতে চান সেক্ষেত্রে আপনার টাইম জোন টাও ছোটো আর আপনার রিস্ক নেওয়ার ক্ষমতাও কম এবং এসব কিছুর উপর বিচার করে আপনাকে ব্লুচিপ এবং হাই ডিভিডেন্ড পে করে এই ধরনের শেয়ার গুলোর দিকে তাকাতে হবে।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন আপনার লক্ষ্যই শেয়ার বাছার জন্য আপনার প্রথম ফিল্টার হিসেবে কাজ করবে। এই ফিল্টার অনুযায়ী,

  • যেসব বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের মাধ্যমে নিয়মিত আয়ের একটা উৎস বানাতে চান তাদের ভালো ডিভিডেন্ড দেওয়া শেয়ার বেছে নিতে হবে এবং যাতে ভবিষ্যতেও সেই ডিভিডেন্ডের ফ্লো অবিচলভাবে চলতে থাকে তার জন্য দেখে নিতে হবে বাছাই করা কোম্পানির ক্যাশ ফ্লো এবং আয় যেন খুব স্থিতিশীল হয়।
  • আবার যাদের ফোকাস পোর্টফোলিও প্রচুর পরিমাণে বাড়ানোর দিকে, তাদের ভালো গ্রোথ স্টক বেছে নিতে হবে। গ্রোথ স্টক মানে খানিকটা নতুনতর কোম্পানি যাদের রেভিনিউ বাড়ার অনেক স্কোপ আছে তবে আয় সেভাবে স্থিতিশীল নয়।
  • আর যারা নিম্নতম রিস্ক নিয়ে নিজেদের ক্যাপিটাল যতটা সম্ভব রক্ষা করে ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট কে বিট করার মতো তবে অন্যান্য ক্ষেত্রের থেকে তুলনামূলক কম রিটার্নেই খুশি তাদের জন্য বেস্ট হচ্ছে বিভিন্ন ব্লু চিপ স্টক গুলো, যেগুলো দশকের পর দশক ধরে স্থিতিশীল এবং অনুমানযোগ্য লাভ দিয়ে আসছে।

দ্বিতীয় ফিল্টারঃ বাজারের সামগ্রিক অবস্থা

পজিশন নেওয়ার আগে বা যেকোনো শেয়ারে বিনিয়োগ শুরু করার আগে আপনাকে সবার প্রথমে দেখে নিতে হবে বাজারের ওভারঅল কন্ডিশন কেমন। কারণ রিসার্চ বলছে 75% স্টক বাজার যেদিকে যায় সেদিকেই মুভ করে। ঠিক যেমন জোয়ার যখন আসে তখন সব নৌকা একসাথে উপরে উঠে যায়, বাজার ভালো চললে ছোট বড় ভালো খারাপ সব শেয়ারের মুভমেন্টই ভালো হয়।

করোনায় বাজার পড়ে যাওয়ার পরই যখন বাজার উঠতে আরম্ভ করেছিল তখনো ঠিক এমনটাই হয়েছিল। শেয়ার বাজারে এমন জোয়ার এসেছিল যে সেই জোয়ারের ঠেলে ভালো তো বটেই এমনকি অনেক যাচ্ছেতাই শেয়ারের দামও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল।

তো এইরকম একটা জোয়ার আসার পরে জোয়ার যখন সর্বোচ্চ সে সময়ে যেকোনো শেয়ারে বিনিয়োগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

যেকোনো সময়ে ইনডেক্সের চার্টের দিকে তাকালে কিংবা চার্টের ওপর যেকোনো মুভিং অ্যাভারেজ ইন্ডিকেটরের অ্যাপ্লাই করলে সে সময়ে বাজারে জোয়ার কতটা আছে সেটার একটা আন্দাজ পাওয়া যায়।

এছাড়াও বাজারের সামগ্রিক অবস্থা বুঝতে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, জিডিপি, বন্ডের দাম ও ইল্ড, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি বিষয় গুলোর দিকেও নজর রাখা যেতে পারে কোম্পানি ও সেক্টর বেছে নেওয়ার আগে।

তৃতীয় ফিল্টারঃ বোধগম্য সেক্টর

বাস্তব জীবনে ভেবে দেখুন, যদি আপনি নিজে কোনো ব্যবসা শুরু করতে চান কি ধরণের ব্যবসা করবেন? যে ধরণের ব্যবসার ক্ষেত্রটা আপনি ভালো বোঝেন সে ধরণের ব্যবসাই করবেন, সিম্পল! তাই না?

নিজের জন্য ভালো শেয়ার বাছাই করার সময়ও এটাই করা উচিৎ। শেয়ার বাজারের লিস্টেড কোম্পানিগুলো আলাদা আলাদা সেক্টরের অন্তর্গত। আর একই সেক্টরের কোম্পানিগুলোর কার্যকলাপ একই রকম হয়। তাছাড়া একটা সেক্টর বুঝলে সেই সেক্টরের বেশিরভাগ কোম্পানির কাজকর্ম বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে এক একটা সময়ে একটা সেক্টরের ব্যবসা ভালো চলে আবার এক একটা সময়ে চলে সেক্টর স্পেসিফিক মন্দা। এই বিষয়গুলোও ভালোভাবে বোঝা যাবে যদি সেক্টর সম্পর্কে ধারণাটা গভীর হয়।

তাই এই ফিল্টার প্রয়োগ করে কোম্পানী বাছার আগে নিজের পছন্দের এক বা একাধিক সেক্টর শর্টলিস্ট করে নিতে হবে।

ভারতীয় শেয়ার বাজারে যে সমস্ত সেক্টরের কোম্পানি লিস্টেড আছে সেই সমস্ত সেক্টর সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়ার জন্য আপনি এই লিংকে যেতে পারেন। সেক্টর গুলো জানতে পারলে সেখান থেকে কোন কোন সেক্টর আপনার পছন্দের বা আপনার বোধগম্য সেগুলো বেছে নিতে সুবিধা হবে।

চতুর্থ ফিল্টারঃ বোধগম্য ব্যবসা

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা বা কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনা মানে আসলে সেই কোম্পানির ছোট্ট একটা অংশের অংশীদার হওয়া। যদি বাস্তব জীবনে আপনাকে কেউ হঠাৎ অজানা কোনো একটা কোম্পানির অংশীদার হতে বলে বা কোম্পানিটা কিনে নিতে বলে আপনি কি কোনো কিছু না জেনে বুঝে বা খোঁজ নিয়েই সেই কোম্পানিতে টাকা ঢালবেন?

আরও পড়ুনঃ  লোন নিয়ে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বা ট্রেডিং - চালাকি নাকি বোকামি?

কখনোই না… তাইতো?!

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বা কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। যে কোম্পানি বা ব্যবসার কার্যকলাপ আপনার বোধগম্য নয় সেই ধরনের কোম্পানিগুলোকে এই তৃতীয় ফিল্টার ব্যবহার করে বাদ দিতে হবে। 

“যে ব্যবসা বোঝো না সে ব্যবসায় কক্ষনো বিনিয়োগ কোরো না।”

-ওয়ারেন বাফেট

একটা কোম্পানি বা তার কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আপনার জ্ঞান যত গভীর হবে, কম্পিটিশনের তুলনায় তার সুযোগ ও ঝুঁকি কেমন সে বিষয়ে তত ভালো ভাবে বুঝতে পারবেন। ভালো শেয়ার বাছাই করা মানে হচ্ছে কোনো কোম্পানির সম্ভাবনা অন্য সবার থেকে ভালোভাবে বুঝতে পারা। আর একটা কোম্পানিকে ভালোভাবে বোঝার একটা উপায় হচ্ছে তাদের ব্যালেন্স শীট-টাকে বোঝা।

এবিষয়ে বিনিয়োগ বিশারদ স্টিভ ক্রনিন বলেছেন, “যদি আপনি আলাদা আলাদা কোম্পানির শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেন তাহলে সেই সমস্ত কোম্পানির ব্যাপারে যতটা সম্ভব জানুন এবং এবং তাদের গল্প, তাদের ব্যালেন্স শীট এবং তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা পোক্ত ধারণা তৈরি করুন যাতে তাদের উপর একটা বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি হয়। এতে কোনো কারণে শেয়ারের দাম পড়ে গেলেও আপনি নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারবেন।”

পঞ্চম ফিল্টারঃ কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ

পরের কাজ হচ্ছে এমন কোম্পানি খুঁজে বের করা যাদের নিজস্ব ব্যবসার ক্ষেত্রে কিছু না কিছু কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ বা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আছে।

ওয়ারেন বাফেট একবার বলেছিলেন, কোনো ইন্ডাস্ট্রি সমাজের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে বা কতটা বাড়বে সেটা বিচার করা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নয়। একটা কোম্পানির কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ কিরকম এবং সেই অ্যাডভান্টেজ কতদিন স্থায়ী থাকবে সেটা নির্ধারণ করাই আসল। যে সমস্ত প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের চারদিকে কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজের এক উঁচু দৃঢ় পরিখা থাকে সেগুলোই বিনিয়োগকারীদের ভালো রিওয়ার্ড দেয়।

একটা কোম্পানির কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ অনেক কিছু থেকেই আসতে পারে। যেমন কোম্পানিটার সাইজ, তার পোর্টফোলিওতে থাকা ইউনিক ব্র্যান্ড, প্রোডাক্ট কোয়ালিটি, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি, ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক, কাস্টমার সার্ভিস ইত্যাদি।

ষষ্ঠ ফিল্টারঃ প্রফিট লস স্টেটমেন্ট, ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট, ব্যালেন্স শীট ও বিভিন্ন আর্থিক অনুপাত 

প্রত্যেকটা লিস্টেড কোম্পানি প্রতি কোয়ার্টারের শেষে এবং / অথবা আর্থিক বছরের শেষে তাদের আয়, খরচ, লাভ, লোকসান, সম্পদ, দায়, শেয়ারহোল্ডিং প্যাটার্ন ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য সম্বলিত প্রফিট লস স্টেটমেন্ট, ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট এবং ব্যালেন্স শীট প্রকাশ করে। আমাদের পরের স্টেপ হচ্ছে সরাসরি সেই সমস্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এবং পরোক্ষভাবে তথ্যগুলো থেকে পাওয়া বিভিন্ন আর্থিক অনুপাতের উপর ভিত্তি করে আরও একটা ফিল্টার প্রয়োগ করা।

এক্ষেত্রে যে যে বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য সেগুলো হলো,

দেনা এবং ডেট টু ইকুইটি রেশিও

ধার নেওয়া কারো জন্যই ভালো নয়। না আমাদের জন্য, না কোনো কোম্পানির জন্য। ধার মানে বোঝা। অনুকূল পরিস্থিতিতে ধার নিয়ে ব্যবসা বাড়াতে সুবিধা হলেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিশাল দেনা একটা কোম্পানির জন্য খুব বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তবে ব্যবসার ক্ষেত্রে ধার নেওয়া খানিকটা নেসেসারি ইভিল-এর মতো। কখনো কখনো ব্যবসার সুবিধার্থে বা ব্যবসা বড় করার জন্য কিছুটা ধার নেওয়ার প্রয়োজনও পড়ে। কিন্তু এই ডেট বা দেনার পরিমাণ যেন সহ্য সীমার মধ্যে থাকে। আর সেটা বোঝার জন্যই দরকার পরে ডেট টু ইকুইটি রেশিওর।

সাধারণত এই ডেট টু ইকুইটি রেশিও 1 এর কম হলে সেটাকে ভালো ধরা হয়। 2 বা তার বেশি হলে সেক্ষেত্রে সেই কোম্পানিটাকে রিস্কি ধরা হয়। আর ডেট টু ইকুইটি রেশিও যদি নেগেটিভ হয় মানে কোম্পানির অ্যাসেটের থেকে দেনা বেশি হয়, সেক্ষেত্রে সেই কোম্পানিটাকে খুবই রিস্কি ধরা হয়।

তবে ডেট টু ইকুইটি রেশিওর এই গাইডলাইন ইন্ডাস্ট্রি স্পেসিফিক। কারণ কোনো কোনো ইন্ডাস্ট্রিতে ওভারঅল সব কোম্পানিতেই ডেট টু ইকুইটি রেশিও বেশি হয়। উদাহরণ স্বরূপ সাধারণত ফাইন্যান্স ইন্ডাস্ট্রিতে ডেট টু ইকুইটি রেশিও অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির থেকে বেশি হয়।

ক্রমবর্ধমান আয় 

আমরা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে চাই আয় বাড়ানোর জন্য। সমস্ত কোম্পানিরও সবসময়েই আয় বাড়াবার প্রচেষ্টা থাকে। কিন্তু সব কোম্পানি বিভিন্ন কারণে এটা করতে সমর্থ হয়না। যে সমস্ত কোম্পানির আয় ক্রমাগত বাড়ে সেসব কোম্পানির শেয়ারের চাহিদাও বাড়ে ও দামও বাড়ে। ফলে ওইসব কোম্পানিতে যারা বিনিয়োগ করেন তারা ঐ লাভটা পান।

যেসব কোম্পানির রেভিনিউ বিগত 5 বছরে প্রতিবছর কমপক্ষে 10% বেড়েছে সেই সমস্ত কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের জন্য আদর্শ।

পিই রেশিও

পিই রেশিও মানে হচ্ছে প্রাইস টু আর্নিং রেশিও। কোনো কোম্পানির শেয়ার প্রাইস কে তার আর্নিংস পার শেয়ার (ইপিএস) দিয়ে ভাগ করলে এই পিই রেশিও পাওয়া যায়। এই পিই রেশিও থেকে কোনো শেয়ার আন্ডারভ্যালুড নাকি ওভারভ্যালুড সেটা সহজেই বুঝে নেওয়া যায়। তবে একটা কোম্পানির সঙ্গে একই ধরনের বা একই সেক্টরের অন্য কোম্পানির পিই রেশিওর তুলনা করতে হয়।

পিই রেশিও ভালো না খারাপ সেটা সবসময়ই আপেক্ষিক ভাবে বিচারযোগ্য। ভারতের বাজারের গড় পিই রেশিও এখন 20 থেকে 25 এর মধ্যে। তাই এই মুহূর্তে ভারতের ক্ষেত্রে পিই রেশিও এর উপরে ভালো ধরা হবে না। তবে আবার কোনো কোনো সেক্টরের ক্ষেত্রে গড় পিই রেশিও এর থেকেও বেশি হতে পারে। সুতরাং কোন পিই রেশিও আসলে ভালো সেটা কোম্পানি এবং কোম্পানিটার সেক্টরের উপর নির্ভর করছে।

রিটার্ন অন ইকুইটি

কোম্পানির নেট ইনকাম কে শেয়ার হোল্ডার ইকুইটি দিয়ে ভাগ করলে রিটার্ন অন ইকুইটি বা আরওই বেরোয়। যেহেতু কোম্পানির অ্যাসেট থেকে ডেট বা দেনা বাদ দিলে শেয়ার হোল্ডার ইকুইটি বেরোয় তাই এই রিটার্ন অন ইকুইটিকে কোম্পানির নেট অ্যাসেটের রিটার্ন ধরা হয়। দশ বছরের জন্য এই আরওই 15% বা তার বেশি হলে ভালো ধরা হয় 

আরও পড়ুনঃ  কেবলমাত্র ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রেখে যারা ঠকছেন তাদের জন্য শেয়ার বাজারে পা রাখার দিশা।

রিটার্ন অন ক্যাপিটাল এমপ্লয়েড

এটা দিয়ে বোঝা যায় কোনো কোম্পানি কত ভালোভাবে তার ক্যাপিটাল ব্যবহার করে কত প্রফিট জেনারেট করছে। বিগত 10 বছরে পছন্দের কোম্পানির রিটার্ন অন ক্যাপিটাল এমপ্লয়েড বা আরওসিই 15% এর থেকে বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

ক্যাশ ফ্লো

একটা কোম্পানি ভালোভাবে চলার জন্য পজিটিভ ক্যাশ ফ্লো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোম্পানির ক্যাশ ফ্লো নেগেটিভ সেই কোম্পানি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাদ দেওয়াই শ্রেয়।

ডিভিডেন্ড ইল্ড

ডিভিডেন্ড ইল্ড হচ্ছে কোনো কোম্পানি এক বছরে তার শেয়ারের দামের তুলনায় যতখানি ডিভিডেন্ড পে করে তার পার্সেন্টেজ। কোন কোম্পানির রেগুলার ভালো লাভ হলে তবেই সেই লাভের অংশ থেকে ডিভিডেন্ড হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের পে করতে পারে। তাই রেগুলার ভালো ডিভিডেন্ড দেওয়া একটা কোম্পানির ভালো সিগন্যাল হিসাবে ধরা হয়। তাছাড়া এই ডিভিডেন্ড একটা এক্সট্রা প্যাসিভ ইনকামের উৎস হিসাবেও কাজ করে।

মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন

সাধারণত বড় বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের জন্য তুলনায় নিরাপদ ধরা হয়। 20000 কোটির বেশি মার্কেট ক্যাপ হলে সেগুলোকে ব্লুচিপ কোম্পানি বলে। আর বিনিয়োগের জন্য সাধারণত 5000 কোটির মার্কেট ক্যাপ এর থেকে বেশি কোম্পানি আদর্শ।

সপ্তম ফিল্টারঃ অন্যান্য বিষয়

উপরের বিষয়গুলো ছাড়াও আরো কিছু বিষয়ের উপর নজর দেওয়া যেতে পারে যেমন,

ইনসাইডার ট্রেডিং

কোম্পানি ইনসাইডার মানে কোম্পানির ভেতরের লোক একটা কোম্পানির ভেতরে কি হচ্ছে সেই সম্পর্কে বাজারের অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের থেকে অনেক বেশি জানেন। এবং তারা সেই অনুযায়ী সেই কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করেন।

তাই যদি দেখা যায় কোন কোম্পানিতে ইনসাইডাররা ক্রমাগত শেয়ার বেচে দিচ্ছেন তাহলে সেটা একটা খারাপ সিগন্যাল হিসাবে ধরা যেতে পারে। আবার এর উল্টোটা হলে গ্রীন সিগন্যাল ধরা যেতে পারে। 

শেয়ারহোল্ডিং

কোম্পানির শেয়ার হোল্ডিং প্যাটার্ন দেখেও সেই কোম্পানি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। সাধারণত কোনো কোম্পানিতে প্রোমোটার হোল্ডিং এবং ইনস্টিটিউশনাল (যেমন মিউচুয়াল ফান্ড) হোল্ডিং বেশি হলে কোম্পানিটা স্টেবল ধরা হয়।

প্রমোটার প্লেজিং

অতিরিক্ত প্রমোটার প্লেজিং একটা কোম্পানির ব্যাপারে ভালো সিগন্যাল দেয়না। এটা মানে সাধারণত বোঝায় কোম্পানির মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। তাই শেয়ার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রমোটার প্লেজিং যত কম হয় তত ভালো। শূন্য হলে সবথেকে ভালো।

ম্যানেজমেন্ট

কোম্পানি ম্যানেজমেন্টে কারা আছেন, তাদের সততা – স্বচ্ছতা এবং কত লম্বা সময় ধরে আছেন সেটাও ভালো কোম্পানি বাছার একটা ফ্যাক্টর। 

অষ্টম ফিল্টারঃ চার্ট

একবার কোনো শেয়ারের সাধারণ লাইন চার্ট বা ক্যান্ডেলস্টিক চার্ট খুলে চোখ বুলিয়ে নিলেই অতীতের সেই শেয়ারের দামের উপর নিচ দেখে শেয়ারটার কোয়ালিটি সম্পর্কে একটা ধারণা করে নেওয়া যায় এবং বর্তমানের দাম কেমন জায়গায় আছে, মানে সস্তা নাকি দামি সেটারও একটা ওভারঅল আইডিয়া পাওয়া যায়।

দরকারি টুল

উপরের ইনস্ট্রাকশন অনুযায়ী সঠিকভাবে বিভিন্ন ভালো কোম্পানির শেয়ার খুঁজতে বা চিনতে এবং সেগুলো স্টাডি করতে কিছু টুল দরকার পড়বে। এ ধরনের কয়েকটা টুলের হদিস নিচে দেওয়া হলঃ

1. গুগল ফিনান্স – এটা গুগলের তরফ থেকে শেয়ার বাজার সংক্রান্ত একটা খুব ভালো টুল। এর মাধ্যমে যেকোনো কোম্পানির সংক্ষিপ্ত চার্ট, সুন্দর ও সংক্ষিপ্তভাবে সাজানো বিগত কয়েক বছরের ইনকাম স্টেটমেন্ট, ব্যালেন্স শীট ও ক্যাশ ফ্লো, গুরুত্বপূর্ণ কিছু নাম্বার, এছাড়া শেয়ার বাজার সংক্রান্ত খবর ও মার্কেট ট্রেন্ড সম্পর্কেও জানতে পারবেন।

2. স্ক্রীনার – এখানে বিভিন্ন কোম্পানির সমস্ত রকম ফিনান্সিয়াল তথ্য খুব বিশদে জানতে পারবেন এবং সমস্ত লিস্টেড কোম্পানির তালিকা থেকে আপনার নিজের প্রয়োজন ও শর্ত অনুযায়ী ফিল্টার বা স্ক্রীন করে আপনার পছন্দের কোম্পানি বের করতে পারবেন।

এখানে বিভিন্নভাবে ফিল্টার করার জন্য ম্যানুয়াল ফিল্টার তৈরি করার পাশাপাশি নতুনদের জন্য বিভিন্ন পপুলার থিমের ওপর আগে থেকে বানানো বিভিন্ন রকম স্ক্রিনিং ফর্মুলা ব্যবহার করে খুব সহজেই পছন্দের শেয়ার খুঁজে বের করা যায়।

3. সিম্প্লি ওয়াল স্ট্রিট – এখানে আগে থেকে করা বিভিন্ন শেয়ারের ওপর রিসার্চ খুঁজে নিতে পারবেন। 

শেষ কথাঃ

এই নিবন্ধে ভালো শেয়ার চেনার নিয়ম নীতি আমার জ্ঞান অনুযায়ী যতটা সম্ভব ছোট করে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তবে আপনি যদি সত্যিই নিজেই নিজের জন্য শেয়ার খুঁজতে এবং বিনিয়োগ করতে চান তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে আরো অনেক বিশদে জানতে হবে। কারণ আপনি যে টাকা বিনিয়োগ করবেন সেটা আপনার এবং সেটা রক্ষা করার দায়িত্ব আপনারই।

ফিল্টার বা স্ক্রিন করার জন্য উপরে দেওয়া ফিল্টারগুলো আপনি আপনার প্রয়োজন মত আগিয়ে পিছিয়ে নিতে পারেন।

আরও একটা কথা, ভালো শেয়ার বাছার থেকে ভালো মিউচুয়াল ফান্ড বাছা কিন্তু অনেক সহজ, সরল এবং সুরক্ষিতও বটে। তাই শেয়ার বাছার জটিলতায় না গিয়ে ভালো মিউচুয়াল ফান্ড বেছে নিতে চাইলে এই লিঙ্কে দেওয়া আর্টিকেল পড়ে নিতে পারেন।

তাহলে আজ এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকবেন।

মন্তব্য করুন