মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুবিধা ও অসুবিধা। বিনিয়োগের আগে জানুন

5/5 - (3 জন রেটিং করেছেন)

“মিউচুয়াল ফান্ড সেহি হে…”

— মুহুর্মুহু বিজ্ঞাপনের দৌলতে এই কথাটা আজ আর কারও কাছেই অপরিচিত নয়। ইদানিংকালে আপামর জনগনের মধ্যে মিউচুয়াল ফান্ডের বিষয়ে যেমন একটা সচেতনতা তৈরি হয়েছে তেমনই ফিক্সড ডিপোজিটের পাশাপাশি বিকল্প বিনিয়োগের রাস্তা হিসাবে এটা বেশ জনপ্রিয়তাও লাভ করেছে।

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের এই বাড়বাড়ন্তের কারণ হচ্ছে এক্ষেত্রে পাওয়া বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা গুলো। আপনিও যদি এভাবে বিনিয়োগে আগ্রহী হন তাহলে আপনাকে বিনিয়োগের আগে ওই সমস্ত সুবিধা এবং তার পাশাপাশি অসুবিধা গুলোর বিষয়েও জেনে নিতে হবে।

মিউচুয়াল ফান্ড কী?

মিউচুয়াল ফান্ড এমন এক ধরনের আর্থিক ইন্সট্রুমেন্ট যেটা বিভিন্ন বিনিয়োগকারীদের টাকা এক জায়গায় জমা করে তৈরি হয়।

লাইসেন্সপ্রাপ্ত অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের আলাদা আলাদা লক্ষ্য অনুযায়ী সাধারণ বিনিয়োগকারীদের থেকে টাকা তুলে আলাদা আলাদা ফান্ড তৈরি করে, এবং পেশাদার ফান্ড ম্যানেজার নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে সেই ফান্ডের টাকা বিশেষ স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের অ্যাসেটে বিনিয়োগ করে।

বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রদেয় অর্থ অনুযায়ী ফান্ডের ইউনিট পেয়ে থাকে। পুরো ফান্ডে যা লাভ হয় সেই অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড পায় আর ফান্ডের ভ্যালুয়েশন বাড়ার সাথে তাদের ইউনিটের ভ্যালুও বাড়তে থাকে। বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে চাইলে ইউনিট রিডিম করতে হয় বা বেচে দিতে হয়। আর সেসময়েই ফান্ডের বর্ধিত ভ্যালুয়েশনের লাভটা হাতে পাওয়া যায়।

মিউচুয়াল ফান্ডের সুবিধা

ভালো রিটার্ন

বিভিন্ন ফান্ডের হিস্টোরিকাল রিটার্ন দেখলে দেখা যায় সাধারণত প্রথাগত বিনিয়োগের বিভিন্ন মাধ্যম যেমন ফিক্সড ডিপোজিট, পিপিএফ ইত্যাদির থেকে এক্ষেত্রে বেশী রিটার্ন পাওয়া যায়। এছাড়া ঐ রিটার্নের হার সাধারণত মুদ্রাস্ফীতির হারের বেশি হয়, ফলে এভাবে বিনিয়োগ করে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকেও সঞ্চয়ের টাকাকে রক্ষা করা যায়।

আরও পড়ুনঃ  মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের আগে এই টার্ম গুলো না জানলেই নয়…

লিকুইডিটি

কোনো অ্যাসেট প্রয়োজন পড়লে যত সহজে ক্যাশে কনভার্ট করা যায় বা ভেঙে টাকা ফেরত পাওয়া যায় সেটাকেই ওই অ্যাসেটের লিকুইডিটি বলে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই লিকুইডিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিউচুয়াল ফান্ড শর্ট টার্মে যখন খুশি বেচা (বা কেনা) যায়, তাই এই একে উচ্চ লিকুইডিটি সম্পন্ন বলে ধরা হয়।

তবে কিছু কিছু ফান্ড (যেমন ইএলএসএস) এর নির্দিষ্ট লকিং পিরিয়ড থাকে এবং তার আগে সহজে ভাঙা যায় না। 

ডাইভারসিফিকেশন

যেকোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানোর সবথেকে ভালো উপায় হচ্ছে ডাইভারসিফিকেশন। ডাইভারসিফাই করা মানে আলাদা আলাদা অ্যাসেটে বিনিয়োগ করা। এক ধরনের অ্যাসেট সব সময় ভালো পারফর্ম করতে পারেনা। আর তাই যত ভিন্ন ভিন্ন অ্যাসেটে বিনিয়োগ করা যায় ততই বিনিয়োগের মোট ভ্যালুকে রক্ষা করা যায়।

মিউচুয়াল ফান্ড, এর প্রকৃতি অনুযায়ী সব সময়ই ডাইভারসিফায়েড। কারণ এতে সব সময়ই একাধিক অ্যাসেট বা অ্যাসেট ক্লাসে বিনিয়োগ করা হয়।

এক্সপার্ট দ্বারা পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট

একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর সাধারণভাবেই বিনিয়োগের ব্যাপারে খুঁটিনাটি জ্ঞান কম থাকে এবং ভালোভাবে না জেনে শুনে সরাসরি বিনিয়োগ করতে গেলে লাভের থেকে বরং ক্ষতির সম্ভাবনাটাই বেড়ে যায়।

মিউচুয়াল ফান্ডে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজাররা পোর্টফোলিও ম্যানেজ করে। সমগ্র বাজারের পরিস্থিতি এবং পোর্টফোলিওর পারফরম্যান্সের উপর নিরবিচ্ছিন্ন নজর রেখে কখন কোন অ্যাসেটে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে, কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে পোর্টফোলিও রিব্যালেন্স করতে হবে ইত্যাদি এ ধরনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারাই সিদ্ধান্ত নেয়।

বিনিয়োগের এই সমস্ত বিষয়গুলো এভাবে একজন এক্সপার্টের হাতে থাকায় একদিকে যেমন নিশ্চিন্তে থাকা যায়, অন্যদিকে এই সমস্ত জটিলতার মধ্যে পড়তে হয়না। তাছাড়া পেশাদারের হাতে বল থাকায় খেলায় ভালো ফল হওয়ার সম্ভাবনাটাও বাড়ে।

ফান্ডের ম্যানেজমেন্ট চার্জ তুলনায় কম

ফান্ড ম্যানেজমেন্টের জন্য ম্যানেজমেন্ট ফি দিতে হয় বটে, কিন্তু যে পরিমাণ ফি দিতে হয় সেটা কেবলমাত্র নিজের বিনিয়োগের জন্য কোনো পেশাদারের সাহায্য নেওয়ার খরচের থেকে অনেক কম হয়। ফান্ড ম্যানেজার একসাথে বিশাল অংকের ফান্ড ম্যানেজ করে বলে শতাংশের বিচারে এই ম্যানেজমেন্ট ফি বা এক্সপেন্স রেশিওটা অনেক কমে যায়।

আরও পড়ুনঃ  মিউচুয়াল ফান্ডে কী কী উপায়ে বিনিয়োগ করা যায়? না জানলে ক্ষতি আপনার!

বিভিন্ন লক্ষ্যের জন্য আলাদা আলাদা ফান্ড

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর লক্ষ্য আলাদা আলাদা হয়। আর প্রত্যেকের আলাদা আলাদা লক্ষ্য অনুযায়ী বিনিয়োগের জন্য বাজারে উপলব্ধ বিভিন্ন ধরনের মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে যেকোনোটা বেছে নেওয়া যায়।

স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত

ফান্ড হাউস বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোকে ফান্ড শুরু করার আগে সবার প্রথমে সরকারি লাইসেন্স নিতে হয়। এবং অতঃপর সেবির গাইডলাইন মেনে চলতে হয়। তাই পুরো বিষয়টা নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা থাকে।

এছাড়া ঐ কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত ফান্ডের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হয়। আর তা থেকে চাইলে খুব সহজেই কোনো একটা ফান্ডে কোন কোন অ্যাসেটে বিনিয়োগ করা হয়েছে জানা যায়। এছাড়া ফান্ড ম্যানেজারের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্স কেমন সেগুলোও যাচাই করে নেওয়া যায়।

ট্যাক্সের সুবিধা পাওয়া যায় 

কিছু মিছু মিউচুয়াল ফান্ডে ট্যাক্স-এর ছাড় পাওয়া যায়। যেমন ইএলএসএস ফান্ডে ১৫০০০০ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ইনকাম ট্যাক্সের ৮০সি সেকশনে ট্যাক্স এক্সেমসন ক্লেম করা যায়।

খুব কম টাকা দিয়েও বিনিয়োগ শুরু করা যায়

কিছু কিছু মিউচুয়াল ফান্ডে ন্যুনতম মাত্র ১০০ টাকা থেকে বিনিয়োগ শুরু করা যায়।

বিনিয়োগের পদ্ধতি সহজ

অনলাইন বা অফলাইন, যে কোনো উপায়েই মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা হোক না কেন পদ্ধতিটা খুবই সরল ও সহজ। আর এসআইপি রুটে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগ শুরু করার পর আগামী ইনস্টলমেন্ট গুলো নিজে নিজেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে ফান্ডে চলে যায়।

মিউচুয়াল ফান্ডের অসুবিধা

খরচ

যেমনটা উপরে বলেছি, খরচ যেমন একদিকে মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে সুবিধা তেমন আবার কখনো কখনো এটা একটা অসুবিধারও কারণ হয়ে যায়। কিছু কিছু ফান্ডে এক্সপেন্স রেশিও হাই হয় এবং অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ের আগে টাকা ফেরত পেতে চাইলে এক্সিট চার্জ দিতে হয়। আবার ডাইরেক্টের বদলে রেগুলার প্ল্যানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত একটা ডিস্ট্রিবিউশন চার্জও লাগে।

আরও পড়ুনঃ  শেয়ার বাজারে ভালো শেয়ার চেনার উপায় প্রথমবার বিনিয়োগের জন্য

স্থির রিটার্ন নয়

মিউচুয়াল ফান্ডে সাধারণত লম্বা সময়ের বিচারে ভালো রিটার্ন পাওয়া গেলেও অল্প সময়ের বিচারে রিটার্নের হারের উত্থান-পতন চলতেই থাকে।

বাজার সংক্রান্ত ঝুঁকি

এক্ষেত্রে বাজার সংক্রান্ত ঝুঁকি থাকেই। ঝুঁকি কমানোর জন্য অনেক কিছু পন্থা অনুসরণ করা হলেও ঝুঁকি কখনোই পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না।

অতিরিক্ত ডাইভারসিফিকেশন লাভের হার কমিয়ে দিতে পারে 

মিউচুয়াল ফান্ডে ঝুঁকি কমানোর জন্য যতটা সম্ভব ডাইভারসিফাই করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এর মাধ্যমে ঝুঁকি কমলেও অতিরিক্ত ডাইভারসিফিকেশন অনেক সময় খারাপ রিটার্নের কারণ হয়।

শেষ কথা

কাঁটা থাকলেও যেমন গোলাপ ফুল তার আবেদন হারায় না ঠিক তেমনি কিছু কিছু ছোটোখাটো অসুবিধা থাকলেও মিউচুয়াল ফান্ড সব সময়ই বিনিয়োগের জন্য একটা ভালো বিকল্প হিসাবেই বিবেচ্য হয়। তবে ভালো ফান্ড বেছে নিতে পারলে অসুবিধেগুলোর অনেকটাই এড়ানো যায়। আর সেটা কিভাবে বেছে নেবেন জানতে হলে এই আর্টিকেলটা পড়ে নিতে পারেনঃ সঠিক ও ভালো মিউচুয়াল ফান্ড চেনার উপায়।


মিউচুয়াল ফান্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন টার্মের অর্থ জানতে চাইলে নীচের আর্টিকেলটা পড়ে নিতে পারেনঃ
মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের আগে এই টার্ম গুলো না জানলেই নয়…

মন্তব্য করুন