শেয়ার বাজার পড়লে বা শেয়ারের দাম কমলে কারা খুশি হন?

5/5 - (3 জন রেটিং করেছেন)

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে অনেক রথী মহারথী বিশাল সম্পদের অধিকারী হয়েছেন। আমরা সবাই এমনিতে মনেকরি যে শেয়ার বাজার বা বিভিন্ন শেয়ারের দাম উঠেছে বলেই তাঁরা বড় বড় লাভ পেয়েছেন এবং এত ধনবান হয়েছেন। কারণ আমরা ভাবি শেয়ার বাজার উঠলেই বা শেয়ারের দাম বাড়লেই বুঝি সব শেয়ারহোল্ডাররা লাভের মুখ দেখেন আর অন্যথায় ক্ষতি হয়। কিন্তু আসলে তা একদমই না। এমনও অনেকে আছেন যারা কখনও কখনও শেয়ার বাজার পড়লেও খুশি হন এবং লাভবানও হন!

কারা, কখন এবং কেন এই উলটপুরাণে খুশি হন, সেটাই আলোচনাই করব এই আর্টিকেলে…

কিন্তু কারা খুশি বা অখুশি হন সেটা খোঁজার আগে জানতে হবে শেয়ার বাজারে অংশগ্রহণকারীরা কত প্রকারের…

শেয়ার বাজারের অংশগ্রহণকারী

শেয়ার বাজারে দুই ধরণের লোক থাকে। একদল ইনভেস্টার, আর একদল ট্রেডার।

ট্রেডাররা ভীষণ ফাস্ট। এই ঢোকেন তো এই বেরিয়ে যান। সেটা কয়েক সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা বা কয়েকদিনের ব্যবধানে হতে পারে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকজন শেয়ার বাজার পড়লে বা শেয়ারের দাম দাম কমলে খুশি হন।

আর ইনভেস্টাররা ভীষণ স্লো। এনারা অনেক ভেবেচিন্তে, অনেক হিসেব কষে তবেই ঢোকেন, তবে একবার ঢুকলে আর বেরোতেই চাননা। এনাদের আসল লক্ষ্য বা চাহিদা থাকে একটাই — শেয়ারের দাম বাড়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো কোনো ইনভেস্টার কখনো কখনো শেয়ারবাজার পড়লেও খুশি হন।

ট্রেডাররা কখন খুশি হন

ট্রেডাররা অনেকরকম উপায়েই ট্রেড করেন, তবে ট্রেডারদের ট্রেড করার ডাইরেকশন দুটোই – লং আর শর্ট।

লং ও শর্ট ট্রেড

লং ট্রেড করা মানে হচ্ছে দাম বাড়বে এই এক্সপেক্টেশন নিয়ে যেকোনো ইন্সট্রুমেন্ট আগে কেনা এবং পরে বেচা।

আরও পড়ুনঃ  বিদেশী কোম্পানির শেয়ারে কিভাবে বিনিয়োগ করা যেতে পারে?

আর শর্ট ট্রেড বা শর্ট সেল মানে পুরোপুরি উল্টো। মানে দাম কমবে এই এক্সপেক্টেশন নিয়ে কোনো ইন্সট্রুমেন্ট আগে বেচে পরে কেনা। মানে নিজের কাছে যে জিনিস নেই সেটা আগেই বেচে দেওয়া এবং স্কয়ার অফ করতে পরে কেনা। শেয়ার মার্কেটের দুনিয়ায় এটাও সম্ভব। যদি এক্সপেক্টেশন অনুযায়ী সেই ইন্সট্রুমেন্টের দাম কমে এবং কম দামে কিনতে সক্ষম হওয়া যায় তাহলে বেচা ও কেনার দামের তফাৎটাই লাভ হিসাবে নিজের কাছে থেকে যায়। 

দাম পড়লেই শর্ট সেলাররা খুশি

সুতরাং শর্ট সেলিং এর থিওরি অনুযায়ী শর্ট সেলাররা সবসময়ই শেয়ার বাজার পড়লে বা তারা যে ইন্সট্রুমেন্ট সেল করেছেন সেই ইন্সট্রুমেন্টের দাম পড়লেই খুশি হন বা লাভের মুখ দেখেন।

ইদানিং সময়ে আদানি – হিন্দেনবার্গ কেস টাও এই জিনিসের উপরই। হিন্দেনবার্গ হচ্ছে আদানির শর্ট সেলার। আদানির শেয়ারের দাম কমলেই ওদের লাভ, এবং তাতেই ওদের খুশি। তাই সত্যি মিথ্যে যাই হোক, আদানির ব্যাপারে নেগেটিভ স্টেটমেন্ট দিয়ে আদানির শেয়ারের দাম কমিয়ে মুনাফা লোটাই ওদের আসল উদ্দেশ্য।

অপশন ডেরিভেটিভ ট্রেডাররা কখন খুশি হন

সরাসরি কোনও কোম্পানির শেয়ার ছাড়াও শেয়ারবাজারে ট্রেডিং করার অন্য একটা ইন্সট্রুমেন্ট হচ্ছে ডেরিভেটিভস। আর ফিউচার বাদে দ্বিতীয় ডেরিভেটিভটা হচ্ছে অপশন।

অপশন আবার দু রকম, কল (CE) আর পুট (PE)। ইনডেক্স বা কোনও শেয়ারের কল অপশন কনট্রাক্ট বা CE-র দাম বাড়ে সেই ইনডেক্স উপরের দিকে উঠলে বা শেয়ারের দাম বাড়লে। মানে এর আচরণ অন্যান্য শেয়ারের মতোই স্বাভাবিক।

কিন্তু পুট অপশন বা PE -র ক্ষেত্রে ব্যাপারটা পুরো উল্টো। এক্ষেত্রে ইনডেক্স নিচের দিকে নামলে বা শেয়ারের দাম কমলে তাদের পুট অপশনের দাম বাড়ে, আর ইনডেক্স বা শেয়ারের দাম বাড়লে তাদের পুট অপশন এর দাম কমে।

এই কল বা পুট প্রত্যেক অপশন কনট্রাক্ট এর ক্ষেত্রেও বিক্রেতা এবং ক্রেতা থাকে। এবং এক্ষেত্রেও যারা ক্রেতা তাদের লং এবং যারা বিক্রেতা তাদের শর্ট হিসাবে ধরা হয়।

সুতরাং কনক্লুশনে যেটা দাঁড়ালো, কল অপশন বিক্রেতা এবং পুট অপশন ক্রেতারা বাজার পড়লে বা শেয়ারের দাম কমলেই খুশি হন কারণ সে ক্ষেত্রেই তাদের লাভ হয়।

আরও পড়ুনঃ  সবথেকে সেরা 10+ চার্ট প্যাটার্ন। এগুলো না জেনে শেয়ার ট্রেডিং সম্ভব নয়।

ইনভেস্টাররা কখন খুশি হন 

ইনভেস্টিং এর প্রধান লজিক বা থিওরি অনুযায়ী ইনভেস্টাররা যেহেতু লম্বা সময়ের জন্য ইনভেস্ট করেন তাই কম সময়ের ব্যবধানে সামান্য ওঠা-পড়ায় এমনিতে তাঁরা তেমন বিচলিত হন না। তবে বাজার পড়লে ইনভেস্টারদের খুশি হওয়ারও কথা নয়, তবুও কখনো কখনো কিছু কিছু পরিস্থিতিতে এনারাও এরকম অবস্থায় খুশিই হন। যে যে পরিস্থিতিতে একজন ইনভেস্টার বাজার পড়লে বা শেয়ারের দাম কমলে খুশি হন সেগুলো হচ্ছে — 

কাছে ক্যাশ থাকলে

যারা শেয়ারবাজারে ইনভেস্ট করেন সাধারণত তাদের শেয়ার বাজারের আয় ছাড়াও অন্য ইনকামের সোর্স থাকে। এবং তারা নিয়মিত ধাপে ধাপে এখানে টাকা ঢোকানো পছন্দ করেন এবং যখন দরকার পড়ে কিছু শেয়ার বিক্রি করে প্রফিট-ও বুক করেন। তাছাড়া প্রফেশনাল ইনভেস্টাররা তাদের পুরো মূলধন কখনোই একসাথে বিনিয়োগ করে দেন না। এবং সব সময়ই কিছু ক্যাশও সংরক্ষিত রাখেন। কিংবদন্তি ইনভেস্টার ওয়ারেন্ট বাফেট বাবুও এই নিয়মই ফলো করেন।

আর এই সমস্ত ইনভেস্টাররা সব সময়ই সুযোগের জন্য মুখিয়ে থাকেন তাদের কাছে থাকা উদ্বৃত্ত ক্যাশ নতুন করে শেয়ার বাজারে ঢোকানোর জন্য। আর এই কাজের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তখনই পাওয়া যায় যখন বাজার পড়ে যায় বা তাদের কোনো পছন্দের শেয়ারের দাম কোনও সাময়িক কারনে কমে যায়।

সুতরাং বাজার পড়ার সময় যে সমস্ত ইনভেস্টারদের কাছে উদ্বৃত্ত ক্যাশ থাকে তারা খুশিই হন।

সদ্য বেচা শেয়ারের দাম পড়লে

একটু আগেই যা বললাম ইনভেস্টাররাও কখনো কখনো যদি তাদের কেনা কোনো শেয়ারের দাম অতিরিক্ত বেড়ে গেছে বলে মনে করেন তখন অনেক সময় সেটা বিক্রি করে প্রফিট বুক করে নেন। যদি সেই শেয়ার পছন্দের শেয়ার হয় এবং এমনিতে কোন সমস্যা না থাকে তবে পরে আবার সেই শেয়ার কেনার মনোভাবও রাখেন। তাই পছন্দের শেয়ার বিক্রি করে প্রফিট বুক করার পরেই যদি শেয়ারের দাম আবার পড়ে যায় তাহলে খুশি হন আবার সেই শেয়ার কম দামে কিনতে পারার জন্য।

আরও পড়ুনঃ  মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুবিধা ও অসুবিধা। বিনিয়োগের আগে জানুন

পছন্দের শেয়ার সঠিক দামে পাওয়ার জন্য

ইনভেস্টাররা ইনভেস্ট করার জন্য সব সময় ভালো কোম্পানি খুঁজতে থাকেন। কিন্তু ভালো কোম্পানি খুঁজে পেলেও বেশিরভাগ সময়ই ভালো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের চাহিদাও বেশি থাকে এবং সহজে ভালো দামে পাওয়া যায় না। তাই যখন কোনো কারণে পছন্দের ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে যায় তখন তারা উৎফুল্ল হন সেই শেয়ার পছন্দের দামে কিনতে পারার জন্য।

ব্রোকার রাও খুশি?

এমনিতে বাজার উঠুক বা পড়ুক, ইনভেস্টার বা ট্রেডাররা লাভ করুক বা ক্ষতি করুক, ব্রোকারের তাতে কিছু এসে যায় না এবং ব্রোকাররা সব সময়ই ব্রোকারেজ পায় এবং লাভও করে।

তবে ব্রোকার দের লাভ বেশি তখনই হয় যখন বাজারে মুভমেন্ট বেশি হয় এবং কেনা-বেচার ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ে। শেয়ারবাজারে হঠাৎ কোনো বড় পতন হলে শেয়ার কেনা বেচার ভলিউম হঠাৎ বেড়ে যায় আর তার ফলে ব্রোকারদের আয়ও কিন্তু উর্ধ্বমুখী হয়।

সুতরাং বাজার বা শেয়ারের দাম পড়লেও ব্রোকাররা খুশিই হয়।

শেষ করার আগে…

আপনি এর মধ্যে কোনো দলে পড়েন নাকি? যদি পড়েন খুব ভালো কথা এখন থেকে শেয়ার বাজার পড়ার সময়ও মজা লোটার প্রস্তুতি নিন। আর যদি এখনো শেয়ার বাজারে আপনার পা না পড়ে থাকে সেক্ষেত্রে ভাবনা চিন্তা করে দেখুন এখানের জলে একটু পা রাখবেন কিনা। শেয়ার বাজার পড়ে গিয়ে লস হওয়ার যেমন ভয় থাকে তেমনই আবার অন্যদিকে এই ধস গুলো সম্ভাবনাও বয়ে নিয়ে আসে কিন্তু…

আজ তাহলে এপর্যন্তই। ভালো থাকবেন। আবার দেখা হবে অন্য কোনও আর্টিকেলে। টা টা। 🙂

মন্তব্য করুন