ক্রেডিট স্কোর কী? এর প্রয়োজনীয়তা কী? না জানলে ক্ষতি আসন্ন

5/5 - (2 জন রেটিং করেছেন)

ক্রেডিট স্কোর কথাটা আশাকরি সকলেরই শোনা। ব্যাংকে লোন নিতে হলে বা ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করতে গেলেই এই ক্রেডিট স্কোরের খোঁজ পড়ে। ব্যাট দিয়ে বল পেটালে ক্রিকেট খেলায় স্কোর হয়। কিন্তু এই ক্রেডিট স্কোর কখন, কার, কিভাবে হয়? এর তাৎপর্যই বা কী? এই স্কোর কত হলে কম আর কত হলে বেশি ধরা হয়? এর নূন্যতম বা অধিকতম মানই বা কত হতে পারে? কোন কাজের জন্য এই স্কোর বাড়ে আর কোন কাজের জন্য কমে?

এই স্কোর সংক্রান্ত এই সমস্ত কিছুই আপনি জানতে পারবেন এই নিবন্ধে।

তবে পুরো কেসটা মাখনের মতো বোঝানোর জন্য আসল কথা শুরু করার আগে এই সম্পর্কিত কয়েকটা অতিরিক্ত প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়ে তারপর আসল বিষয়ে আসছি…

ক্রেডিট ব্যুরো কী?

ক্রেডিট ব্যুরো কে অনেকসময় ক্রেডিট রিপোর্টিং এজেন্সিও বলা হয়। এরা হল এমন এক সংস্থা যারা বিভিন্ন ব্যাংক ও অন্যান্য ঋণ প্রদানকারী সংস্থার থেকে সমস্ত ঋণ গ্রহীতার ঋণ নেওয়া ও শোধ করা সংক্রান্ত ইতিহাস সংগ্রহ করে।

ভারতবর্ষে স্বীকৃত সবথেকে বড় ক্রেডিট ব্যুরো গুলো হল,

ক্রেডিট রিপোর্ট কী?

ব্যাংকিং-এর দুনিয়ায় ক্রেডিট মানে হচ্ছে ঋণ বা ধার। আর ধার নেওয়া ও শোধ করার বিস্তারিত বিবরণীর নামই ক্রেডিট রিপোর্ট। সাধারণত ক্রেডিট ব্যুরো গুলো ক্রেডিট ইতিহাসের প্রেক্ষিতে এই রিপোর্ট তৈরি করে।

ক্রেডিট স্কোর কী?

এই ক্রেডিট স্কোর হল কোনো ব্যক্তির ক্রেডিট রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ক্রেডিট ব্যুরোর তরফে দেওয়া তিন অঙ্ক বিশিষ্ট একটা সংখ্যা যেটা তার ঋণযোগ্যতার পরিচায়ক। মানে কারও এই স্কোর দেখে এক ঝলকেই একটা আন্দাজ পাওয়া যায় তার ঋণ নেওয়া ও শোধ করার অতীত কতটা ভালো বা কলঙ্কিত। এবং এটা দেখেই সেই ব্যাক্তিকে নতুন ঋণ দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঋণ পাওয়ার জন্য সেই ব্যক্তি কতটা যোগ্য সেটা নির্ধারণ করা হয়।

আরও পড়ুনঃ  পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ডঃ সুবিধা নাকি ঝঞ্ঝাট?

একটু আগে যে ক্রেডিট ব্যুরোগুলোর কথা বললাম ভারতবর্ষে সেই প্রত্যেকটা ক্রেডিট ব্যুরো তাদের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী আলাদা আলাদা ক্রেডিট স্কোর দিয়ে থাকে। ঋণ যোগ্যতা অনুযায়ী যার স্কোর হাই হওয়ার কথা প্রত্যেক ব্যুরোর তরফ থেকে দেওয়া স্কোর তার ক্ষেত্রে হাই-ই হয় বা লো হওয়ার কথা হলে লো-ই হয়। তবে সবার স্কোরিং সিস্টেমে কিছু তফাৎ থাকার জন্য প্রত্যেক ব্যুরোর নির্ধারিত স্কোর একটু উপর নিচে হয়।

তবে ভারতবর্ষে ট্রান্স ইউনিয়ন সিবিলের ক্রেডিট স্কোর, মানে শর্টকাটে যেটাকে সিবিল স্কোর বলা হয়, সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয়।

ক্রেডিট স্কোরের রেঞ্জ ও তার অর্থ

এই স্কোর সাধারণত 300 থেকে 900 এর মধ্যে একটা সংখ্যা হয়। নীচের টেবিলে বিভিন্ন ক্রেডিট স্কোরের রেঞ্জ এবং সেটা কি অর্থ বহন করে তা দেওয়া হলঃ

ক্রেডিট স্কোরঅর্থ
NA/NHএটা মানে হচ্ছে প্রযোজ্য নয় (Not Applicable) বা ইতিহাস নেই (No History)। যদি আপনি কখনো কোনো লোন না নিয়ে থাকেন বা কোনো ক্রেডিট কার্ড না ব্যাবহার করে থাকেন তাহলে আপনার কোনো ক্রেডিট ইতিহাস তথা ক্রেডিট স্কোর থাকেনা। 
300-549এই রেঞ্জের মধ্যে স্কোর থাকলে সেটা খারাপ স্কোর হিসাবে ধরা হয়। এর মানে হচ্ছে আপনি আপনার ক্রেডিট কার্ডের বিল, লোনের ইএমআই ইত্যাদি মাঝেমধ্যেই শোধ করতে দেরি করেন। এই রেঞ্জের স্কোর হলে নতুন ক্রেডিট কার্ড বা লোন পেতে খুবই অসুবিধার মধ্যে পড়তে হবে কারণ এত কম স্কোর মানে ধরে নেওয়া হবে আপনার ডিফল্টার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
550-649এই রেঞ্জের স্কোর চলনসই বলে ধরে নেওয়া হয়। এর মানে হচ্ছে সময় মত দেয় শোধ করতে আপনাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই রেঞ্জে স্কোর থাকলে লোন হয়তো পেয়ে যাবেন তবে আপনার জন্য ধার্য সুদ হয়তো বেশি হবে। 
650-749এর মধ্যে স্কোর থাকলে সেটা ভালো স্কোর হিসাবে বিবেচিত হয়। এক্ষেত্রে লোন পেতে বা নতুন ক্রেডিট কার্ড পেতে এমনিতে কোনো সমস্যা হবে না, তবে  লোনের সবথেকে সেরা সুদটা পাওয়ার জন্য আপস-আলোচনা করার স্কোপ হয়তো আপনি পাবেন না। 
750-900এই রেঞ্জের ক্রেডিট স্কোর মানে অসাধারণ। এর মানে আপনি আপনার সমস্ত রকম ক্রেডিট পেমেন্ট নিয়মিত এবং সময়ের মধ্যে করেন। আপনার ক্রেডিট ইতিহাস দুর্দান্ত ও কলঙ্কহীন। এক্ষেত্রে ব্যাংক আপনাকে নিজে থেকেই লোন ও ক্রেডিট কার্ড দিতে চাইবে এবং আপনি বাজারের সবথেকে সেরা সুদটাও পাবেন।

কোন কোন বিষয়ের উপর এই স্কোর নির্ভরশীল?

আলাদা আলাদা ক্রেডিট ব্যুরো ক্রেডিট স্কোর নির্ধারণ করতে কিছুটা আলাদা নিয়ম অনুসরণ করলেও যেটুকু তফাৎ হয় সেটা উনিশ-বিশ। এখানে আমি ক্রেডিট স্কোর নির্ধারণের সাধারণ ফ্যাক্টর গুলো তুলে ধরলাম…

আরও পড়ুনঃ  সেরা 9 লাইফটাইম ফ্রি রুপে ক্রেডিট কার্ড। এখন ইউপিআই-তেও ক্যাশব্যাক!

ঋণ শোধের ইতিহাস

এই স্কোর নির্ধারণের জন্য সবথেকে বেশি ওয়েটেজ দেওয়া থাকে ঋণশোধের ইতিহাসের উপরে। স্কোরের 30-35% এর উপরেই নির্ভর করে। ঋণ শোধের ইতিহাস মানে কত সময়মত বা সময়ের কত পরে দেয় শোধ করা হয়েছে তার রেকর্ড। সুতরাং কোনো একটা দেয় বা ইনস্টলমেন্টের ডিউ ডেট মিস করলে তার নেতিবাচক প্রভাব ক্রেডিট স্কোরের উপর সব থেকে বেশি পড়ে।

ঋণ নেওয়ার পরিমাণ

ক্রেডিট স্কোরে এর ওয়েটেজ 25-30%। আপনি যদি বিশাল পরিমাণের একাধিক লোন নেন কিংবা ক্রেডিট কার্ডের পুরো লিমিট শেষ করে ফেলেন বা নিয়মিত লিমিটের কাছাকাছি খরচ করেন অর্থাৎ যদি আপনার ক্রেডিট ইউটিলাইজেশন রেশিও যদি বেশি হয় সেক্ষেত্রে এই স্কোরের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

ঋণের বয়স

আপনার ক্রেডিট ইতিহাসের বা ঋণের বয়সের উপর এই স্কোর নির্ভর করে 15%। যত লম্বা সময় ধরে আপনি একটা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করবেন বা লোন নেওয়ার পর যত লম্বা সময় ধরে নিয়মিত শোধ করতে থাকবেন ততই আপনার ঋণের বয়স লম্বা হবে এবং আপনার ক্রেডিট স্কোর বাড়বে।

ঋণের রকমফের

আপনি কত বিভিন্ন ধরনের লোন নিয়েছেন বা লোন অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছেন তার বিভিন্নতার উপর ক্রেডিট স্কোর নির্ধারণের ওয়েটেজ থাকে 10%। বিভিন্ন ধরনের লোন মানে ক্রেডিট কার্ড, বাই নাও পে ল্যাটার, হোম লোন, পার্সোনাল লোন ইত্যাদিকে বোঝায়।

সাম্প্রতিক কার্যকলাপ

ইদানিংকালে আপনার ক্রেডিট সম্পর্কিত কার্যকলাপের উপর এই স্কোরের 10% নির্ভর করে। এই কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে কম সময়ের মধ্যে অনেক ক্রেডিট কার্ড বা বন্ধকহীন লোনের অ্যাপ্লাই করা, হঠাৎ ক্রেডিট ইউটিলাইজেশন রেশিও বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

কোন কোন বিষয়ের উপর এই স্কোর নির্ভরশীল নয়?

যে যে বিষয়ের উপর ক্রেডিট স্কোর নির্ভরশীল নয় বা যে বিষয়গুলোতে কোনো ধরনের পরিবর্তন এর উপর কোন প্রভাব ফেলে না সেগুলো হল—

  • ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা ইত্যাদি।
  • বয়স।
  • চাকরি, পদ, আয় ইত্যাদি।
  • ঠিকানা।
  • সফ্ট ক্রেডিট এনকোয়ারি।
আরও পড়ুনঃ  10 বছরে কিভাবে কোটিপতি হওয়া যায়? এটা কি আদৌ সম্ভব...?

ক্রেডিট স্কোর ভালো হলে কি কি সুবিধা পাওয়া যায়?

  • সহজে এবং তাড়াতাড়ি এমনকি পূর্ব-অনুমোদিত ক্রেডিট কার্ড বা লোন পাওয়া যায়।
  • নিম্নতম সুদে এবং বেশি টাকার লোন পাওয়া যায়।
  • অনেক সময় প্রসেসিং ফি-তে ছাড় পাওয়া যায়।

কী কী কারণে এই স্কোর কমে?

যে যে কারণে স্কোরের উপর নেগেটিভ প্রভাব পড়ে সেগুলো হল,

  • ঋণ সংক্রান্ত কোনো পেমেন্ট (যেমন কোনো ইএমআই, ক্রেডিট কার্ড বিল ইত্যাদি) মিস করা, দেরি করে দেওয়া বা না দেওয়া ক্রেডিট স্কোর কমে যাওয়ার সবথেকে বড় কারণ। তবে দু তিন বছরে দু একবার পেমেন্ট মিস করলে এই স্কোরের উপর ততটা বেশি প্রভাব পড়ে না। কিন্তু ডিউ ডেট মিস হওয়ার পর পেমেন্ট করতে যত দেরি হয় এবং এটা যত ঘনঘন হতে থাকে স্কোরের উপর প্রভাব পড়ে তত বেশি।
  • খুব কম সময়ের মধ্যে ঘন ঘন ক্রেডিট কার্ড বা অন্যান্য লোনের অ্যাপ্লাই করলে উত্তরোত্তর হার্ড এনকোয়ারি হওয়ার জন্য জন্য (লোন বা ক্রেডিট কার্ড অ্যাপ্রুভ হোক বা না হোক) স্কোর কিছুটা কমে যায়।
  • ক্রেডিট ইউটিলাইজেশন রেশিও বেশি হলে এই স্কোর কমে।
  • খুব পুরনো ক্রেডিট কার্ড ক্লোজ করে দিলে ক্রেডিটের বয়স কমে যায় তাই স্কোর কমে।

ভালো ক্রেডিট স্কোর পাওয়ার জন্য কিছু টিপস

  • সময় মত পেমেন্ট করতে হবে।
  • ক্রেডিট কার্ডের ক্রেডিট লিমিটের 30%-এর থেকে বেশি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • একাধিক ক্রেডিট কার্ড বা লোনের জন্য অ্যাপ্লাই করতে হলে অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মাঝখানে যথেষ্ট পরিমাণ গ্যাপ দিতে হবে।
  • পুরানো ক্রেডিট কার্ড প্রয়োজন না পড়লেও সেটাকে ক্লোজ করার প্রয়োজন নেই। ব্যবহার না করতে চাইলে কার্ডটাকে জাস্ট ফেলে রাখা যেতে পারে বা ফিজিক্যালি নষ্ট করে দেওয়া যেতে পারে।
  • বেশি বন্ধকহীন-লোন নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। 
  • একবার লোনের আবেদন খারিজ হলে সাথে সাথেই অন্য কোনো ব্যাংকে আবেদন করা যাবে না। চেষ্টা করতে হবে প্রথমবার আবেদন করার এক বছরের ভেতরে দ্বিতীয় বার আবেদন না করতে।
  • কেবলমাত্র এক ধরনের ক্রেডিট অ্যাকাউন্ট থাকলে বিভিন্ন ধরনের ক্রেডিট অ্যাকাউন্ট বানাতে হবে।

ক্রেডিট স্কোর চেক করা

ক্রেডিট ব্যুরো থেকে ক্রেডিট স্কোর চেক করা দুই ধরনের হতে পারে।

  • 1) ব্যাংকে কোনো ক্রেডিট কার্ড বা লোনের জন্য অ্যাপ্লাই করলে ব্যাংক নিজে ক্রেডিট ব্যুরো থেকে আপনার ক্রেডিট স্কোর ও ক্রেডিট রিপোর্ট জানার জন্য যে এনকোয়ারি করে সেটাকে হার্ড এনকোয়ারি বলা হয়।
  • 2) আপনি নিজে ক্রেডিট স্কোর চেক করার জন্য যে এনকোয়ারি করেন কিংবা বিভিন্ন কোম্পানি অ্যাপ্লিকেশন ভেরিফিকেশন বাদে প্রমোশনাল অফার বা অন্যান্য কারণে যদি এনকোয়ারি করে সেটাকে সফট এনকোয়ারি বলা হয়।

আপনি নিজে যদি এভাবে সফট ইনকয়ারি করার মাধ্যমে নিজের ক্রেডিট স্কোর জানতে চান, তাহলে ক্রেডিট ব্যুরোর ওয়েবসাইটে গিয়ে সাইন আপ করার মাধ্যমে করতে পারেন।

যেমন সিবিল ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি সিবিল স্কোর জানতে পারবেন। এছাড়া অনেক থার্ড পার্টি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকেও নিজের ক্রেডিট স্কোর ফ্রিতেই জানতে পারা যায়। এমনই একটা থার্ড পার্টি ওয়েবসাইট হলো পয়সাবাজার ডট কম

শেষ কথাঃ

শেষকালে একটাই কথা বলব লোন নেওয়া ও শোধ করা, দুই ব্যাপারেই রেস্পন্সিবল হতে হবে। তাহলে শুধু ক্রেডিট স্কোর কেন জীবনের অন্যান্য দিকের ভারসাম্যও বজায় থাকবে।

আজ তাহলে এখানেই ইতি টানি… ভালো থাকবেন। 🙂

মন্তব্য করুন