সোনায় বিনিয়োগ করার 7 টা উপায়। আমার পছন্দ #6

5/5 - (3 জন রেটিং করেছেন)

মেয়েরা যা পেলে খুব খুশি হয় সেটা হচ্ছে সোনা। বিয়ের সময় কনে শ্বশুরবাড়িতে যা যা নিয়ে যায় তার মধ্যে যেটা কম হলে খোঁটা শুনতে হয় সেটাও সোনা। প্রেমিকাকে প্রেমিকার দেওয়া সবথেকে বেশি ব্যবহৃত আদুরে নাম বা খোকা-খুকুকে ডাকার পছন্দের নামও সোনা।

সোনার উপর ভারতবাসীর ভালবাসা চিরন্তন। তবে উপরের কয়েকটা উদাহরণ হিমশৈলের চূড়ার মতোই। ‘সোনার’ ব্যবহার আরও সুবিশাল! কিন্তু এই সোনার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হওয়া উচিৎ যে ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে বিনিয়োগ।

যদি আপনি টাকা জমানোর জন্য কেবলমাত্র ফিক্সড ডিপোজিটের উপর ভরসা করে থাকেন তবে এক্ষুনি সাবধান হোন! ফিক্সড ডিপোজিট সম্পদ তৈরির রাস্তা হতে পারেনা। আজকের দিনে বিনিয়োগের অন্যান্য রাস্তাগুলোর দিকেও একটু তাকানো খুবই জরুরী।

আর এই ‘অন্য’ রাস্তায় বিনিয়োগ করতে গেলেই বা বিনিয়োগে বৈচিত্র্যতা আনতে গেলেই চলে আসে এই সোনারই নাম। এখানে থাকলো এর মাধ্যমে ট্রাডিশনালি বিনিয়োগ করার উপায় সহ নতুন যুগের নতুন উপায়ে বিনিয়োগ করার সাত সাতটি রাস্তা বা কৌশল।

সোনায় বিনিয়োগ করা কেন জরুরী?

ব্যাংকে করা ফিক্সড ডিপোজিটকে বিনিয়োগ হিসাবে ধরাই চলেনা। যদি আপনি ওইটুকু করেই ক্ষান্ত হন তাহলে আপনি যেমন লম্বা সময়ের বিচারে মুদ্রাস্ফীতির কাছে হারছেন তেমনই সম্পদ বানানোর বিশাল সম্ভাবনামুলক দিক গুলো থেকেও বাদ পড়ছেন। সম্পদ বানাতে হলে জমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ করাটাও জরুরী। আর বিনিয়োগ করা মানে শেয়ার বাজারে কিছুটা হলেও অংশ নিতেই হয়, সেটা সরাসরি শেয়ার কিনেই হোক বা পরোক্ষভাবে মিউচুয়াল ফান্ড বা ইটিএফ-এর মাধ্যমেই হোক। আর শেয়ার বাজার যেহেতু ভীষণ ভোলাটাইল বা পরিবর্তনশীল, তাই সেটার সাথে ডিল করতে হলে বিনিয়োগের মধ্যে বৈচিত্র বা টাইভারসিফিকেশন আনাটা জরুরী।

আর বিনিয়োগ ডাইভারসিফাই করতে হলেই সব থেকে বেশি যেটার প্রয়োজন সেটা হচ্ছে সোনা। কারণ ইতিহাস বলছে শেয়ার মার্কেটে যখনই কোন অনিশ্চয়তা দেখা যায় বা বড়সড় পতন হয় তখনই এর দাম বাড়তে থাকে। তাই ছোট থেকে বড় ইনভেস্টাররা নিজের শেয়ার বাজারের বিনিয়োগ কে সাপোর্ট করার জন্য সোনা বা এই রিলেটেড ইন্সট্রুমেন্টে কিছুটা অন্তত বিনিয়োগ করে থাকেন। আর বড় বড় ইনভেস্টারদের ফলো করে এই কাজে আমাদের সকলেরও অংশ নেওয়া উচিত। 

সোনায় বিনিয়োগ করার ট্র্যাডিশনাল / ফিজিক্যাল উপায়

ট্রাডিশনালি সোনায় বিনিয়োগ করা মানে বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে যেটা চলে আসছে সেটাই। মানে ফিজিক্যাল গোল্ড বা প্রকৃত সোনা কেনা। আর এক্ষেত্রে সেই মান্ধাতার আমল থেকে চলে আসা উপায়গুলো আজও অনুসরণ করা হয়…

আরও পড়ুনঃ  10 বছরে কিভাবে কোটিপতি হওয়া যায়? এটা কি আদৌ সম্ভব...?

সোনার গয়না কেনা

গয়নার উপর শুধু ভারতীয় মেয়েদের না, বলতে হয় সারা পৃথিবীবাসীর দুর্বলতা আছে। আর তাইতো সারা পৃথিবীতে যত সোনা উৎপাদন হয় তার অর্ধেক গয়না বানাতেই ব্যবহৃত হয়। গয়না যেমন দেখতে – দেখাতে ভালো লাগে, তেমনই নিজ কালেকশনে ভারী ভারী গয়না থাকলেও ভালো লাগে। কিন্তু বিনিয়োগ হিসেবে গয়না কিনে রাখাটা খুব একটা ভালো কাজ না। কারণ…

  • গয়নার মেকিং চার্জে 3-25% এক্সট্রা চলে যায়।
  • গয়না কিনলে সেটা রাখার বা রক্ষা করার ঝামেলা পোহাতে হয়। আর এর জন্য লকার ভাড়া করতে হলে 700 থেকে 10-12 হাজার টাকা পর্যন্ত লেগে যায়। আবার ইন্সুরেন্স করতে হলে তার জন্যেও নিয়মিত একটা প্রিমিয়াম খরচ হয়।
  • গয়না কেনার সময় ট্যাক্স হিসেবে 3% জিএসটি দিতে হয়। এমনকি কেনার তিন বছর পর আপনি যদি সেটা বিক্রি করতে চান তাহলেও লাভের অংকের উপর 20% লং টার্ম ক্যাপিটাল গেন ট্যাক্স দিতে হয়।
  • আর যদি একটু টাকা বাঁচাতে গিয়ে আবার আপনি হলমার্কিং ছাড়া গয়না কেনেন তাহলে তো পুরোই কেস। সোনার নাম করে আপনাকে কি যে দিয়ে দেবে সেটা আপনি ধরতেও পারবেন না। 

সুতরাং বুঝতেই পারছেন সোনার গয়না কিনে বিনিয়োগ হিসাবে লাভ করতে চাইলে চাপ আছে, কারণ লাভের গুড় তো ‘পিঁপড়ে’-র পেটেই চলে যায়!

আর সমস্যা যে শুধু গয়না কেনার সময় হয় তা নয়। কখনো টাকার প্রয়োজন পড়লে যদি সেই গয়না বিক্রি করে টাকা পেতে হয় সে ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। কোথা থেকে গয়না কিনেছেন বা সেটা কতখানি খাঁটি এসবের উপর ভিত্তি করে বিক্রি করার সময় ন্যায্য দাম পাওয়াটাও সহজ হয় না।

গোল্ড স্কিমে বিনিয়োগ করা

এত কিছু সত্ত্বেও গয়নাই যদি পছন্দ হয় সেক্ষেত্রে গয়না কেনার জন্য এককালীন টাকা বিনিয়োগ করা ছাড়াও গোল্ড স্ক্রিম-এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করার-ও সুযোগ আছে। সাধারণত বিভিন্ন জুয়েলারি থেকে এই স্কিম গুলো প্রোভাইড করা হয়। এই স্কিমগুলো অনেকটা ব্যাংকের রেকারিং ডিপোজিটের মত। প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অ্যামাউন্ট ডিপোজিট করতে হয় নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। মেয়াদ শেষে জমা টাকার সম অংকের দামের গয়না কেনা যায়। তবে যেহেতু রেকারিং ডিপোজিট এর মত এক্ষেত্রে ইন্টারেস্ট দেওয়া হয় না তাই সাধারণত জুয়েলারির তরফে একটা বোনাস এর সাথে যোগ করা হয় এবং সেটা সাধারণত লাস্ট ইনস্টলমেন্টের সমান এমাউন্টের হয়।

তবে এই উপায়টি যদি বেছে নিতেই হয় তবে একটু সাবধান হন। এবং বড় কোন জুয়েলারির এ ধরনের স্কিম বেছে নিন। কারণ ছোট অপরিচিত জুয়েলারি হলে সেটা চিটফান্ড স্কিম ক্যাটিগরি তে চলে আসতে পারে। 

আরও পড়ুনঃ  মিউচুয়াল ফান্ড কত ধরণের হয়? জানুন আর সঠিক ফান্ড বেছে নিন।

সোনার কয়েন, বিস্কুট বা বার কেনা

তবে ফিজিক্যাল বা প্রকৃত সোনায় বিনিয়োগের মাধ্যম হিসাবে সোনার কয়েন, বিস্কুট বা বার কেনা গয়না কেনার থেকে তুলনামূলক ভালো বিকল্প।

গয়না কেনার ক্ষেত্রে যে সমস্ত সমস্যা গুলো আছে সেগুলো এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য তবে গয়নার ক্ষেত্রে যে 3-25% মেকিং চার্জ লাগে সেটা কয়েন এর ক্ষেত্রে 2-10% আর বিস্কুট বা বারের ক্ষেত্রে 0.5% বা তারও কম হয়।

সোনায় বিনিয়োগ করার আধুনিক / ডিজিটাল উপায়

এই আধুনিক ডিজিটাল যুগে সোনাও ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। সোনায় বিনিয়োগ করার জন্য প্রকৃত সোনা কেনার ঝামেলা এড়িয়েও বা ফিজিক্যাল সোনা না কিনেও এতে বিনিয়োগ করা যায়।

ডিজিটাল গোল্ড

আজকের দিনের বিভিন্ন নতুন ফিনটেক পেমেন্ট অ্যাপগুলোতে (যেমন ফোনপে, পেটিএম, জিপে ইত্যাদি) চাইলে খুব সহজেই অনলাইন ট্রানজাকশনের মাধ্যমে ডিজিটাল গোল্ড কেনা যায়। এই অ্যাপগুলো সাধারণত কোনো গোল্ড ট্রেডার বা ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তাদের প্লাটফর্মে যে পরিমাণ ডিজিটাল গোল্ড কেনাবেচা হয় সেটাকে সম পরিমাণ ফিজিক্যাল গোল্ড দিয়ে ব্যাকিং করে। মানে আপনি যদি এই ধরনের কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিজিটাল গোল্ড কেনেন তাহলে এই প্ল্যাটফর্ম আপনার হয়ে সেই ভ্যালুর ফিজিক্যাল গোল্ড ওদের কাছে স্টোর রাখে।

আপনি যে পরিমাণ ডিজিটাল গোল্ড কিনবেন, চাইলে পরে সেটা ডিজিটাল গোল্ড হিসেবেই ওই প্ল্যাটফর্মেই সেল করতে পারবেন এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ওই অ্যামাউন্ট এর ফিজিক্যাল গোল্ড আপনি বাড়িতে হোম ডেলিভারিও নিতে পারবেন।

গয়না বা অন্যান্য ফর্মের ফিজিক্যাল সোনার থেকে এই ডিজিটাল গোল্ড বা ডিজিটাল সোনায় বিনিয়োগ করা অনেক বেশি সুবিধাজনক। কারণ…

  • স্টোর করা বা সেফটির জন্য কোনো চিন্তা করতে হয় না এবং পাঁচ বছর পর্যন্ত কিনে রাখার জন্য কোন স্টোরেজ চার্জ দিতে হয় না।
  • কোনো মেকিং চার্জ লাগেনা।
  • মাত্র 1 টাকা থেকে শুরু করে ডিজিটাল গোল্ডে বিনিয়োগ করা যায়।

সার্বভৌম গোল্ড বন্ড

ভারত সরকারের তরফে সার্বভৌম গোল্ড বন্ডের প্রথম প্রবর্তন করা হয় 2015 সালে। তারপর থেকে প্রতি বছর ধাপে ধাপে কয়েক মাস অন্তর অন্তর রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া এই বন্ড বাজারে ছাড়ে।

সাধারণত এই বন্ডের ম্যাচিউরিটি পিরিয়ড হয় 8 বছর আর লক ইন পিরিয়ড থাকে 5 বছর। 8 বছর পর এমনিতেই ক্যাশ হিসেবে রিডিম করা যায়। 5 বছরের পর থেকে ছয় মাস ছাড়া ছাড়া রিডিম করার সুযোগ দেওয়া হয় যে সময়ে চাইলে রিডিম করে নেওয়া যায়। আর 5 বছরের আগে রিডিম করা যায় না তবে সেকেন্ডারি মার্কেটে ক্রেতা পেলে বন্ড বিক্রি করে দেওয়া যায়। 

সময়ের সাথে সাথে সোনার দাম বাড়ার সঙ্গেই যেমন এই বন্ডেরও দাম বাড়ার সুযোগ থাকে, তার সাথে সাথে আবার বার্ষিক 2.5% হারে সুদ-ও দেওয়া হয়।

আরও পড়ুনঃ  সবথেকে নিরাপদ উপায়ে কিভাবে টাকা ডবল বা দ্বিগুণ হবে? #6 আমার পছন্দ

উপরন্তু ম্যাচিউরিটিতে এই বন্ডে পাওয়া লাভের উপর কোনও ট্যাক্স দিতে হয় না। তবে সুদ হিসেবে যেটা পাওয়া যায় বা 5 বছরের আগে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রি করে লাভ হলে সেটা ট্যাক্স ফ্রি হয় না। 

গোল্ড ই টি এফ

গোল্ড ইটিএফ এক ধরনের এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ।

এটাও ওই ডিজিটাল গোল্ডের মতোই। এক্ষেত্রেও আন্ডারলাইং অ্যাসেট ফিজিক্যাল গোল্ড। ইউনিট হিসাবে খুব কম দাম থেকে শুরু করেই এতে বিনিয়োগ করা যায়। তবে গোল্ড ইটিএফ-এ বিনিয়োগ করতে হলে ডিম্যাট একাউন্টের দরকার পড়ে। ডিম্যাট একাউন্ট থেকে শেয়ার বাজার চলাকালীন অন্যান্য শেয়ারের মতই খুব সহজেই কেনাবেচা করা যায়।

এক্সপেন্স রেশিও, ব্রোকারেজ ও ডিমাট একাউন্ট চার্জ ধরলে এক্ষেত্রে 0.5-1% পর্যন্ত এক্সট্রা চার্জ পড়তে পারে।

গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ড

গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ড এক ধরনের মিউচুয়াল ফান্ড। এ ধরনের ফান্ডে সাধারণত ফিজিক্যাল গোল্ড, সোনা সম্পর্কিত সিন্ডিকেট এবং মাইনিং কোম্পানিতে ইনভেস্ট করা হয়।

অন্যান্য মিউচুয়াল ফান্ডের মতোই গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ডে ইনভেস্ট করতে হলে ব্যাংক বা অন্য কোন মিউচুয়াল ফান্ড কোম্পানিতে অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে করতে হয়। তবে এখন বিভিন্ন ফিনটেক অ্যাপের মাধ্যমেও গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যায়।

এক্ষেত্রে চার্জ গোল্ড ইটিএফ এর থেকে সামান্য বেশি পড়ে।

শেষ করার আগে…

উপরে সোনায় বিনিয়োগ করার 7 টা আলাদা আলাদা উপায় এর ব্যাপারে জানতে তো পারলেন। এর মধ্যে থেকে সেরা কোনটা সেটা আপনাকেই বেছে নিতে হবে। কারণ আমার জন্য সেটা সেরা সেটা আপনার পছন্দের নাও হতে পারে। তাই দেরি না করে আপনার পছন্দের উপায় টা বেছে নিন এবং আজই বিনিয়োগ শুরু করুন। আজ তাহলে এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকবেন। টা টা 🙂


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)

সোনায় বিনিয়োগ করার সেরা উপায় কী?

আমার মতে গোল্ড ইটিএফ। কারণ যখন খুশি চাইলেই বেচে দেওয়া যায়।

সোনা নাকি শেয়ার বাজার কোথায় বিনিয়োগ করা ভালো?

সোনায় ঝুঁকি কম কিন্তু রিটার্ন-ও কম। আবার শেয়ার বাজারে ঠিক উল্টো। এমনিতে শেয়ার বাজারে ইনডেক্স ইটিএফ-এর ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে সোনার থেকে বেশি রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই দুয়ের মধ্যে আমার তো ইনডেক্স ইটিএফ-ই বেশী পছন্দ। তবে দুই ক্ষেত্রেই ভাগ করে বিনিয়োগ করে ডাইভারসিফিকেশন করাও খারাপ নয়।


মন্তব্য করুন